কবি পরিচিতি
দত্ত, মাইকেল মধুসূদন (১৮২৪-১৮৭৩) মহাকবি, নাট্যকার, বাংলাভাষার সনেট প্রবর্তক, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে, এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে মধুসূদনের শিক্ষারম্ভ হয়। প্রথমে তিনি সাগরদাঁড়ির পাঠশালায় পড়াশোনা করেন। পরে সাত বছর বয়সে তিনি কলকাতা যান এবং খিদিরপুর স্কুলে দুবছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন।
হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালেই মধুসূদনের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮৩৪ সালে তিনি কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মধুসূদন উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি সবসময় মেধার পরচিয় দেন। ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করনে এবং তাঁর নামের পূর্বে ‘মাইকেল’ শব্দটি যুক্ত হয়। কিন্তু হিন্দু কলেজে খ্রিস্টানদের অধ্যয়ন নিষিদ্ধ থাকায় মধুসূদনকে কলেজ ত্যাগ করতে হয়। তাই ১৮৪৪ সালে তিনি বিশপ্স কলেজে ভর্তি হন এবং ১৮৪৭ পর্যন্ত এখানে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখার সুযোগ পান।
এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর পিতাও এক সময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। অগত্যা মধুসূদন ভাগ্যান্বেষণে ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২) এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬) করেন।
মাদ্রাজের সঙ্গে মধুসূদনের জীবনের অনেক ঘটনা জড়িত। এখানেই তিনি সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি Eurasion (পরে Eastern Guardian), Madras Circulator and General Chronicle ও Hindu Chronicle পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং Madras Spectator-এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (১৮৪৮-১৮৫৬)। মাদ্রাজে অবস্থানকালেই Timothy Penpoem ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladie (১৮৪৮) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past প্রকাশিত হয়। রেবেকা ও হেনরিয়েটার সঙ্গে তাঁর যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ এখানেই সংঘটিত হয়। মাদ্রাজে বসেই তিনি হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা করেন।
এর মধ্যে মধুসূদনের পিতামাতা উভয়ের মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরিয়েটাকে নিয়ে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা আসেন। সেখানে তিনি প্রথমে পুলিশ কোর্টের কেরানি এবং পরে দোভাষীর কাজ করেন। এ সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেও তিনি প্রচুর অর্থোপার্জন করেন। তাঁর বন্ধুবান্ধবরা এ সময় তাঁকে বাংলায় সাহিত্যচর্চা করতে অনুরোধ জানান এবং তিনি নিজেও ভেতর থেকে এরূপ একটি তাগিদ অনুভব করেন। রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী (১৮৫৮) নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব অনুভব করেন এবং তাঁর মধ্যে তখন বাংলায় নাটক রচনার সংকল্প জাগে। এই সূত্রে তিনি কলকাতার পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এমন একটি পরিস্থিতিতে নাট্যকার হিসেবেই মধুসূদনের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ ঘটে। তিনি মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে ১৮৫৮ সালে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। এটিই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক এবং একই অর্থে মধুসূদনও বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাট্যকার।
পরের বছর মধুসূদন রচনা করেন দুটি প্রহসন: একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। প্রথমটিতে তিনি ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলদের মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে কটাক্ষ করেন এবং দ্বিতীয়টিতে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আচারসর্বস্ব ও নীতিভ্রষ্ট সমাজপতিদের গোপন লাম্পট্য তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রেও মধুসূদন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রহসন দুটি কাহিনী, সংলাপ ও চরিত্রসৃষ্টির দিক থেকে আজও অতুলনীয়।
মধুসূদনের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি যাকিছু রচনা করেছেন তাতেই নতুনত্ব এনেছেন। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ বাংলা সাহিত্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। তখনকার বাংলা সাহিত্যে রচনার শৈলীগত এবং বিষয়ভাবনাগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তা অসাধারণ প্রতিভা ও দক্ষতাগুণে দূরীভূত করেন। ১৮৬০ সালে তিনি গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার বরেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম এবং এর ফলে তিনি বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে এবং এই ছন্দে একই বছর তিনি রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। পরের বছর ১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনী নিয়ে একই ছন্দে তিনি রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি । এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। আর কোন রচনা না থাকলেও মধুসূদন এই একটি কাব্য লিখেই অমর হয়ে থাকতে পারতেন। এই কাব্যের মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন এবং তাঁর নব আবিষ্কৃত অমিত্রাক্ষর ছন্দও বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রামায়ণে বর্ণিত অধর্মাচারী, অত্যাচারী ও পাপী রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক, বীর যোদ্ধা ও বিশাল শক্তির আধাররূপে চিত্রিত করে মধুসূদন উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা লাভ করেন। এক্ষেত্রে তিনি ভারতবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে প্রকৃত সত্য সন্ধান ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বাংলা সাহিত্যে তা তুলনাহীন।
মধুসূদনের কাব্যে এক ধরনের নারীবিদ্রোহের সুর লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যের নায়িকাদের মধ্য দিয়ে যেন যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত, আত্ম সুখ-দুঃখ প্রকাশে অনভ্যস্ত ও ভীত ভারতীয় নারীরা হঠাৎ আত্মসচেতন হয়ে জেগে ওঠে। তারা পুরুষের নিকট নিজেদের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং কামনা-বাসনা প্রকাশে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। তাঁর বীরাঙ্গনা (১৮৬২) পত্রকাব্যের নায়িকাদের দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। এখানে জনা, কৈকেয়ী, তারা প্রমুখ পৌরাণিক নারী তাদের স্বামী বা প্রেমিকদের নিকট নিজেদের কামনা-বাসনা ও চাওয়া-পাওয়ার কথা নির্ভীকচিত্তে প্রকাশ করে। নারীচরিত্রে এরূপ দৃঢ়তার প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের আগে আর কারও রচনায় প্রত্যক্ষ করা যায় না। মধুসূদনের এ সময়কার অপর দুটি রচনা হলো কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) ও ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১)। প্রথমটি রাজপুত উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত একটি বিয়োগান্তক নাটক এবং দ্বিতীয়টি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য। এ পর্বে মধুসূদন দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং কিছুদিন হিন্দু প্যাট্রিয়ট (১৮৬২) পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৮৬২ সালের ৯জুন মধুসূদন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত যান এবং গ্রেজ-ইন-এ যোগদান করেন। সেখান থেকে ১৮৬৩ সালে তিনি প্যারিস হয়ে ভার্সাই নগরীতে যান এবং সেখানে প্রায় দুবছর অবস্থান করেন। ভার্সাইতে অবস্থানকালে তাঁর জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এখানে বসেই তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা ভাষায় এটিও এক বিস্ময়কর নতুন সৃষ্টি। এর আগে বাংলা ভাষায় সনেটের প্রচলন ছিল না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ভার্সাই নগরীতে থেকেই তিনি যেন মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে নতুনভাবে এবং একান্ত আপনভাবে দেখতে ও বুঝতে পারেন, যার চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘বঙ্গভাষা’, ‘কপোতাক্ষ নদ’ ইত্যাদি সনেটে। তাঁর এই সনেটগুলি ১৮৬৬ সালে চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী নামে প্রকাশিত হয়।
ভার্সাই নগরীতে দুবছর থাকার পর মধুসূদন ১৮৬৫ সালে পুনরায় ইংল্যান্ড যান এবং ১৮৬৬ সালে গ্রেজ-ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৬৭ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে ফিরে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় যোগ দেন। কিন্তু ওকালতিতে সুবিধে করতে না পেরে ১৮৭০ সালের জুন মাসে মাসিক এক হাজার টাকা বেতনে হাইকোর্টের অনুবাদ বিভাগে যোগদান করেন। দুবছর পর এ চাকরি ছেড়ে তিনি পুনরায় আইন ব্যবসা শুরু করেন। এবারে তিনি সফল হন, কিন্তু অমিতব্যয়িতার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অমিতব্যয়িতার ব্যাপারটি ছিল তাঁর স্বভাবগত। একই কারণে তিনি বিদেশে অবস্থানকালেও একবার বিপদগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং বিদ্যাসাগরের আনুকূল্যে সেবার উদ্ধার পান। ১৮৭২ সালে মধুসূদন কিছুদিন পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহ দেও-এর ম্যানেজার ছিলেন।
জীবনের এই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েও মধুসূদন কাব্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। হোমারের ইলিয়াড অবলম্বনে ১৮৭১ সালে তিনি রচনা করেন হেক্টরবধ। তাঁর শেষ রচনা মায়াকানন (১৮৭৩) নাটক। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর ১২টি গ্রন্থ এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ৫টি গ্রন্থ রয়েছে।
মধুসূদন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগপ্রবর্তক কবি। তিনি তাঁর কাব্যের বিষয় সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত সংস্কৃত কাব্য থেকে, কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ অনুযায়ী সমকালীন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী করে তিনি তা কাব্যে রূপায়িত করেন এবং তার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়। উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মধুসূদন তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভার দ্বারা বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি আবিষ্কার করে এই ভাষা ও সাহিত্যের যে উৎকর্ষ সাধন করেন, এরফলেই তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘মধুকবি’ নামে পরিচিত।
বাংলার এই মহান কবির শেষজীবন অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে কেটেছে। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। শেষজীবনে তিনি উত্তরপাড়ার জমিদারদের লাইব্রেরি ঘরে বসবাস করতেন। স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন বাংলার এই মহা কবি কপর্দকহীন অবস্থায় জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
কাব্য পরিচিতি
মেঘনাদবধ কাব্য ১৯-শতকীয় বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কর্তৃক অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা একটি মহাকাব্য। এটি ১৮৬১ সালে দুই খণ্ডে বই আকারে প্রকাশিত হয়। কাব্যটি মোট নয়টি সর্গে বিভক্ত। মেঘনাদবধ কাব্য হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ অবলম্বনে রচিত, যদিও এর মধ্যে নানা বিদেশী মহাকাব্যের ছাপও সুস্পষ্ট।
গ্রিক রীতিতে হিন্দু পূরাণের কাহিনী অবলম্বন করে এই কাব্যটি রচিত। এর মূল উপজীব্য রামায়ণ। মধুসূদনের মেঘনাদ বধ কাব্য সর্বাংশে আর্য রামায়নকে অনুসরণ করে রচনা করেন নি। প্রতিটি চরিত্রের উপর বাল্মীকির থেকে ইংবেঙ্গলের প্রভাব অনেক বেশী৷ এটি অমিত্রাক্ষর ছন্দ বা ‘ফ্রি ভার্সে’ রচিত। অমিত্রাক্ষরে প্রথম রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য(১৮৬০)। এরপর মেঘনাদ বধ কাব্য(১৮৬১) রচনা করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে।
“বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটুকু মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ‘বধো’ (বধ) নামক ষষ্ঠ সর্গ থেকে সংকলিত হয়েছে। সর্বমোট নয়টি সর্গে বিন্যস্ত ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে মৃত্যু ঘটে অসমসাহসী বীর মেঘনাদের।
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাল্মীকি-রামায়ণকে নবমূল্য দান করেছেন এ কাব্যে। মানবকেন্দ্রিকতাই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সারকথা। ওই নবজাগরণের প্রেরণাতেই রামায়ণের রাম-লক্ষ্মণ মধুসূদনের লেখনীতে হীনরূপে এবং রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদ যাবতীয় মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত। দেবতাদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত রাম-লক্ষ্মণ নয়, পুরাণের রাক্ষসর্জ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদের প্রতিই মধুসূদনের মমতা ও শ্রদ্ধা। “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি ১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। প্রথম পঙক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় পঙক্তির চরণান্তের মিলহীনতার কারণে এ ছন্দ ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ নামে সমধিক পরিচিত। এ কাব্যাংশের প্রতিটি পঙক্তি ১৪ মাত্রায় এবং ৮+৬ মাত্রার দুটি পর্বে বিন্যস্ত। লক্ষ করার বিষয় যে, এখানে দুই পঙক্তির চরণাধিক মিলই কেবল পরিহার করা হয়নি, যতিপাত বা বিরামচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহারও হয়েছে বিষয় বা বক্তব্যের অর্থের অনুষঙ্গে। এ কারণে ভাবপ্রকাশের প্রবহমানতাও কাব্যাংশটির ছন্দেরবিশেষ লক্ষ্মণ হিসেবে বিবেচ্য।
চরিত্র পরিচিতি
মেঘনাদ
মেঘনাদ রাবণের পুত্র। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ মহাকাব্যের নায়ক। তাঁর দেশপ্রেম, বীরত্ব এবং পিতৃভক্তিই এ কাব্যের প্রধান উপজীব্য।
রাবণ মেঘনাদকে সঙ্গে নিয়ে দিগ্বিজয়ে বার হয়ে স্বর্গ আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে মেঘনাদের অস্ত্রাঘাতে ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত অজ্ঞান হয়ে পড়লে জয়ন্তর পিতামহ পুলোমা তাঁকে নিয়ে সকলের অজ্ঞাতে পালিয়ে যান। শোকে মুহ্যমান হয়ে ইন্দ্র রাবণকে অস্ত্রাঘাত করেন। ফলে রাবণ অজ্ঞান হয়ে যান। মেঘনাদ শিবের বরে মায়াপ্রভাবে অদৃশ্য অবস্থায় যুদ্ধ করে ইন্দ্রকে পরাভূত ও বন্দী করেন। ইতিমধ্যে রাবণের জ্ঞান ফেরে এবং তিনি ইন্দ্রকে লঙ্কায় বন্দী করে আনেন।
দেবতাদের অনুরোধে এক বছর বাদে ব্রহ্মা (হিন্দুদের প্রধান তিন দেবতার একজন) ইন্দ্রকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। তিনি মেঘনাদকে ইন্দ্রজিৎ নাম দেন এবং ইন্দ্রের মুক্তির প্রতিদানে মেঘনাদকে বরদান করতে চান। মেঘনাদ অমরত্বের বর চান। কিন্তু ব্রহ্মা তা দিতে রাজি হন না। তখন পরিবর্তে মেঘনাদ এই বর চান যে যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি ইষ্টদেব অগ্নির পূজা করবেন এবং অগ্নিসম্ভূত অশ্ব দ্বারা চালিত রথে যুদ্ধে গেলে তিনিই অজেয় হবেন; কিন্তু যজ্ঞ অসমাপ্ত রেখে যুদ্ধে গেলে তাঁর মৃত্যু হবে। এই বরের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মেঘনাদ নিজের বিক্রমে অমরত্ব চান। ব্রহ্মা তা মেনে নেন।
মেঘনাদ রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘটিত লঙ্কার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি যুদ্ধে গমন করার পূর্বে যজ্ঞানুষ্ঠান করতেন। এই যজ্ঞের বলে অজেয় হয়ে তিনি দুইবার রাম ও লক্ষ্মণকে পরাভূত করেন। কিন্তু তৃতীয় বারে বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ যজ্ঞাগারে উপস্থিত হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় তাঁকে বধ করেন।
বিভীষণ
বিভীষণ রাবণের ছোট ভাই। মেঘনাদের চাচা। তার বাবার নাম বিশ্রবা এবং মায়ের নাম নিকষা। লঙ্কার যুদ্ধের সময় বিভীষণ নিজ দেশ ও পরিবারের পক্ষ ত্যাগ করে রামের পক্ষে যোগদান করেন এবং ক্রমাগত বিভিন্ন ধরনের গোপন সংবাদ দিয়ে রাবণের পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে নিরস্ত্র মেঘনাদকে হত্যা করে। এখান থেকে “ঘরের শত্রু বিভীষণ” এই বাংলা বাগধারাটির উৎপত্তি। হিন্দ্য ধর্মে ও পুরাণে মেঘনাদকে পরম ধার্মিক হিসাবে চিত্রায়িত করা হলেও মধুসূদন তার কাব্যে বিভীষণকে চরম বিশ্বাসঘাতক, স্বার্থপর একজন মানুষ হিসাবেই তুলে ধরেছেন।
লক্ষ্মণ
লক্ষ্মণ হলেন হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণের একটি চরিত্র। তিনি রামের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ে লক্ষ্মণকেও অবতার বা রামের অপর রূপ মনে করা হয়। আবার কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ে তাঁকে শেষনাগের অবতার মনে করা হয়।
অযোধ্যার রাজা দশরথের কনিষ্ঠা মহিষী সুমিত্রার দুই যমজ পুত্র হলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। তিনি রামের অত্যন্ত অনুগত ছিলেন। তিনি রামকে পিতার আদেশের বিরুদ্ধে বনগমনে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রাম বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে, লক্ষ্মণও তাঁর সঙ্গে বনে যান। বনবাসকালে তিনি একাধারে রামের ভাই, বন্ধু ও সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। লঙ্কার যুদ্ধে তিনি রাবণের পুত্র মেঘনাদকে বধ করেন।
রাবণ
রাবণ ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের অন্যতম প্রধান চরিত্র ও প্রধান খলনায়ক। তিনি মহাকাব্য ও পুরাণে বর্ণিত লঙ্কা (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) দ্বীপের রাজা। রামচন্দ্রের পত্নী সীতাকে হরণ করে তিনি লঙ্কায় নিয়ে যান। সীতার উদ্ধারকল্পে কিষ্কিন্ধ্যার বানরসেনার সাহায্যে রামচন্দ্র লঙ্কা আক্রমণ করলে রাবণের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। এই ঘটনা রামায়ণ মহাকাব্যের মূল উপজীব্য। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে তাঁর পূর্বজীবনের কথা বলা হয়েছে। রাবণের প্রকৃত নাম দশগ্রীব। তার রাবণ নামটি শিবের দেওয়া। জনপ্রিয় শিল্পে তার দশটি মাথা, দশটি হাত ও দশটি পা দর্শিত হয়। রামায়ণ মহাকাব্যে কামুক ও ধর্ষকামী বলে নিন্দিত হলেও মেঘনাদ বধ কাব্যে রাবণকে মহাজ্ঞানী, তাপস, দেশপ্রেমী বীর হিসাবেই চিত্রায়িত করা হয়েছে। উত্তর ভারতে দশেরা উৎসবে রাবণের কুশপুত্তলিকা দাহ আজও এক জনপ্রিয় প্রথা। রাবণ আদি যুগে সর্বপ্রথম মর্তে উড়ন্ত যান পুষ্পক রথ ব্যবহার করেন।
রাম
রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক। বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম ছিলেন রাজা দশরথ ও তাঁর জ্যৈষ্ঠা মহিষী কৌশল্যার জ্যৈষ্ঠ ও প্রিয়তম পুত্র। রামায়ণে রামকে মর্যাদা পুরুষোত্তম অর্থাৎ সর্বগুণের আধার বলে অভিহিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়া স্ত্রী কৈকেয়ীর চক্রান্তে দশরথ রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে যাওয়ার নির্দেশ দিতে বাধ্য হন। রামও পিতার আজ্ঞা শিরোধার্য করে বনবাসে গমন করেন।
কুম্ভকর্ণ
কুম্ভকর্ণ রাবণের মধ্যম ভ্রাতা। বিশ্রবা মুনির ঔরসে সুমালী রাক্ষসের কন্যা কৈকসীর (নিকষা) গর্ভে তার জন্ম। লঙ্কার যুদ্ধে অসংখ্য রাম সৈন্য ও বানরদের হত্যা করার পরে রামের হাতে তার মৃত্যু হয়।
সীতা
রামের প্রিয়তমা পত্নী এবং রাজা জনকের পালিতা কন্যা। সীতার অপর নাম জানকী। তিনি বিষ্ণুপত্নী দেবী লক্ষ্মীর অবতার। রামায়ণে তাঁকে নারীজাতির আদর্শস্থানীয়া বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি স্বামীর সঙ্গে বনবাসে গমন করেন। রাবণ তাঁকে অপহরণ করে লঙ্কায় বন্দী করে রাখেন। রাম রাবণকে পরাজিত করে তাঁকে উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে তিনি রামের দুই যমজ পুত্র লব ও কুশের জন্ম দেন।
দশরথ
অযোধ্যার রাজা ও রামের পিতা। তাঁর তিন পত্নী: কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা এবং রাম ব্যতীত অপর তিন পুত্র: ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। দশরথের প্রিয়তমা পত্নী কৈকেয়ী তাঁকে বাধ্য করেন রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে পাঠিয়ে ভরতকে যুবরাজ ঘোষণা করতে। রাম বনে গেলে পুত্রশোকে দশরথের মৃত্যু হয়।
কবিতার পটভূমি
অযোধ্যায় দশরথ নামে একজন রাজা ছিলেন। তার তিন’শরও বেশি রানী ছিলেন। কিন্তু এত রানীর মধ্যেও তিন রানীই ছিলেন প্রধান: বড় রানী কৌশল্যা, মেঝ রানী কৈকয়ী ও ছোট রানী সুমিত্রা। তার তিন রাণীর গর্ভে চার পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কৌশল্যার সন্তান ছিলেন রামচন্দ্র, কৈকয়ীর সন্তান ভরত এবং সুমিত্রার দুই জমজ সন্তান ছিলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন।
একবার দেবাসুরের যুদ্ধে দেবতাদের সাহায্য করতে গিয়ে দশরথ ভীষণরূপে আহত হন এবং কৈকয়ীর সেবায় ও যত্নে আরোগ্যলাভ করেন। সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে দশরথ কৈকয়ীকে দুইটি বরদানে প্রতিশ্রুত হন। রাবণ যখন তার বড় পুত্র রামকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন তখন ক্রুরমতি দাসী মন্থরার প্ররোচনায় কৈকয়ী দশরথের কাছে প্রতিশ্রুত এক বরে ভরতের রাজ্যলাভ এবং অন্য বরে রামে চৌদ্দো বছরের বনবাস প্রার্থনা করেন।
পিতৃসত্য রক্ষা করার জন্য রাম ১৪ বছরের বনবাসে চলে যান। তার সঙ্গী হন স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণ। এক আশ্রম থেকে অন্য আশ্রমে বাস করে রাম তার নির্বাসন জীবন যাপন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারা পঞ্চবটী নামের একটি বনে এসে উপস্থিত হন।
এ বনের পাশে ছিল সাগর আর সাগরের ওপারে ছিল রাক্ষসদের দেশ লঙ্কা রাজ্য যা শ্রীলঙ্কা বা স্বর্ণলঙ্কা নামে পরিচিত ছিল। সে রাজ্যের রাজা ছিলেন রাবণ। তার পিতার নাম ছিল বিশ্রবা এবং মায়ের নাম নিকষা। তার দুই ভাইয়ের নাম ছিল কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ। বোনের নাম শূর্পণখা।
পঞ্চবটীর বনে ঘুরতে এসে রাবণের বিধবা বোন শূর্পণখা রামের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে প্রণয় নিবেদন করলে রাম কর্তৃক প্রত্য্যাখাত ও বিতাড়িত হয়ে সীতাকে গ্রাস করবার চেষ্টা করে। রামের আদেশে লক্ষ্মণ এই রাক্ষসীর নাক ও কান কেটে দেন। শূর্পণখা তার অপমানের কথা রাবণকে জানায়। রাবণ বোনের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাড়কা রাক্ষসীর পুত্র মারীচকে সাথে নিয়ে পঞ্চবটীর বনে উপস্থিত হন। মায়াবী মারীচ স্বর্ণমৃগের রূপ ধারণ করে করে সীতার সম্মুখে ভ্রমণ করতে লাগল। সীতা তখন রামকে ঐ স্বর্ণমৃগ এন দিতে অনুরোধ করে। রাম ঐ স্বর্ণমৃগের অনুসরণ করে এবং এক পর্যায়ে তাকে শরাঘাত করে। শরবিদ্ধ মারীচ রামের স্বর অনুকরণ করে “হায় লক্ষ্মণ, হায় সীতা” বলে প্রাণত্যাগ করল। এই কাতরোক্তি শুনে রামের বিপদ আসন্ন ভেবে সীতা লক্ষ্মণকে রামকে সাহায্য করার জন্য প্রেরণ করে। এই সুযোগে রাবণ পরিব্রাজকবেশে এসে বলপূর্বক সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে আসেন।
সীতার শোকে তার স্বামী রাম ও দেবর দুজনেই পাগলের মতো হয়ে গেলেন। অবশেষে তারা জানতে পারলেন যে সমুদ্রের ওপারে লঙ্কা নামে একটি দ্বীপ আছে, সে দ্বীপে রাক্ষসদের বাস, তাদের রাজা রাবণ, তিনি-ই সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে গেছেন।
সীতাকে উদ্ধার করার জন্য রাম-লক্ষ্মণ হনুমান বাহিনী নিয়ে লঙ্কা আক্রমণ করে। তখন দুই পক্ষের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হয়। রাবণের ছোট ভাই বিভীষণ নিজ পক্ষ ত্যাগ করে রামের পক্ষাবলম্বন করে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাবণের মেজ ভাই কুম্ভকর্ণ এবং বড় ছেলে বীরবাহু নিহত হন। তখন রাবণ তার আরেক ছেলে মেঘনাদকে পরবর্তী দিনের যুদ্ধের সেনাপতি নির্বাচন করেন।
মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতার যজ্ঞ করতে থাকেন যাতে করে ব্রহ্মার প্রতিশ্রুত অগ্নিসম্ভূত অশ্ব দ্বারা চালিত রথ উত্থিত হয়। কিন্তু তার যজ্ঞপালনের মাঝখানে যজ্ঞাগারে রামের ভাই লক্ষ্মণ এসে হাজির হয় এবং নিরস্ত্র মেঘনাদকে যুদ্ধে আহ্বান করে। ইতোমধ্যে লক্ষ্মণ তলোয়ার কোষমুক্ত করলে মেঘনাদ যুদ্ধসাজ গ্রহণের জন্য সময় প্রার্থনা করে লক্ষ্মণের কাছে। কিন্তু লক্ষ্মণ তাকে সময় না দিয়ে আক্রমণ করে। তখন নিরস্ত্র মেঘনাদ তার পূজোর কোষা ছুড়ে লক্ষ্মণকে আক্রমণ করে এবং অজ্ঞান করে ফেলে। লক্ষ্মণের একক প্রয়াসে পথ চিনে যজ্ঞাগারে প্রবেশ নিয়ে নিরন্তর চিন্তা মেঘনাদকে অস্থির করে তুলে। মূর্চ্ছিত লক্ষ্মণকে যজ্ঞগৃহে রেখে অস্ত্র সন্ধানে মেঘনাদ যখন অস্ত্রাগারের দিকে ছোটে যায় তখন যজ্ঞগৃহে প্রহরারত বিভীষণকে দেখে যাবতীয় ধাঁধার অবসান হয়। মূহুর্তে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায় তার কাছে। খুল্লতাত বিভীষণকে প্রত্যক্ষ করে দেশপ্রেমিক নিরস্ত্র মেঘনাদ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, সেই নাটকীয় ভাষ্যই “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” অংশে সংকলিত হয়েছে।
মূল পাঠ এবং ব্যাখ্যা
“এতক্ষণে”-অরিন্দম কহিলা বিষাদে –
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষঃপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষোঃশ্রেষ্ট?
‘অরি’ মানে শত্রু। আর ‘অরিন্দম’ মানে হচ্ছে ‘শত্রুকে দমন করেন যে’। এখানে ‘অরিন্দম’ বলতে মেঘনাদকে বুঝানো হয়েছে। মেঘনাদ এতক্ষণ পর্যন্ত সকল কাজের মধ্যে একটি প্রশ্নের মীমাংসা খুঁজে বেড়িয়েছেন, লক্ষ্মণ কী করে পথ চিনে নিকুম্ভিলা যজ্ঞগৃহে পৌঁছাতে পারলেন। বিভীষণকে যজ্ঞগৃহের দরজায় পাহারারত অবস্থায় দেখে সব প্রশ্নের উত্তর জানা হল তাঁর। দেশশত্রু পিতৃব্যই খালা কেটে কুমীর ডেকে এনেছেন।
…শুলিশম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ?
‘শূলপাণি’ মানে ‘শূল পাণিতে যার’। এখানে ‘পাণি’ অর্থ হচ্ছে হাত। শূলপাণি বলতে মহাদেবকে বুঝানো হয়েছে যেহেতু তিনি হাতে ত্রিশুল ধারণ করেন। হিন্দু পুরান থেকে আমরা জানি যে মহাদেবের প্রধান অস্ত্র ত্রিশুল, তার ধনুকের নাম পিনাক। আবার ‘শম্ভু’ও হচ্ছে মহাদেব বা শিবের আরেকটি নাম। ‘নিভ’ মানে হচ্ছে মতো। তাহলে ‘শূলিশম্ভুনিভ’ এর অর্থ দাঁড়ায় শূলপাণি মহাদেবের মতো।
ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী।
ভ্রাতৃপুত্র মানে ভাইয়ের ছেলে। এখানে বিভীষণের ভাই রাবণের সন্তান মেঘনাদের কথা বলা হয়েছে। ‘বাসব’ হচ্ছে দেবতা ইন্দ্রের আরেক নাম। যেহেতু মেঘনাদ যুদ্ধে ইন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন তাই তাকে ‘বাসববিজয়ী’ বলা হয়েছে। একই কারণে মেঘনাদের অপর নাম ইন্দ্রজিৎ।
নিজ গৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
‘তাত’-শব্দের মূল অর্থ পিতা। এখানে চাচা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘তস্কর’ –শব্দের অর্থ চোর; এখানে লক্ষ্মণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিভীষণ নিজ রাজ্যের তথা ঘরের পথ লক্ষ্মণকে দেখিয়ে দিয়ে তাকে (লক্ষ্মণ) নিকুম্ভিলা যজ্ঞাঘারে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
চণ্ডাল মানে হচ্ছে ছোট বা নীচু জাতের লোক। আলয় মানে হচ্ছে ঘর। রাজার আলয়ে অর্থাৎ রাবণের প্রাসাধে নীচু জাতের লক্ষ্মণকে আনার কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি
পিতৃতুল্য।…
বিভীষণের এই অনুচিত দেশবিরোধী কাজে উত্তেজিত দেশবাসীর সর্ব্বেন্দ্রীয় ধিক্কারে ও ক্রিয়াশীল প্রত্যাঘাতে মেঘনাদের অন্তর ফেটে পড়তে চাইছে। কিন্তু এমনই পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষা তাঁর যে বল প্রয়োগে বিভীষণকে হটানো তো দূরের কথা, কোনো দুর্বিনীত কটুবাক্য বা গালিগালাজ বর্ষণ থেকেও নিজেকে অপূর্ব ধীরতায় নিজেকে তিনি বিরত রাখলেন। এতকিছু করার পরও মেঘনাদ তার চাচা বিভীষণকে তিরষ্কার করে না। কারণ বিভীষণ মেঘনাদের পিতার ছোটো ভাই। তিনি গুরু জন, পিতার মতো।
…ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
মেঘনাদ বিভীষণকে অনুরোধ করে দরজা ছেড়ে দাঁড়ানোর জন্য। ‘দ্বার’-মানে হচ্ছে দরজা। ‘রামানুজ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে রাম + অনুজ এ দুটির শব্দের সন্ধির মাধ্যমে। ‘অনুজ’ মানে হচ্ছে ছোটো ভাই। এখানে রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণের কথা বলা হচ্ছে। আবার ‘শমন’ হচ্ছে যমরাজের অন্য নাম। ‘শমন-ভবন’ বা যমালয়ে পাঠানো মানে হচ্ছে হত্যা করা। এ লাইনে মেঘনাদ অস্ত্রগার থেকে অস্ত্র এনে লক্ষ্মণকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।
‘ভঞ্জিব’-মানে দূর করবো। আর ‘আহব’-শব্দের অর্থ হচ্ছে যুদ্ধ। এখানে যুদ্ধ করে লক্ষ্মণকে হত্যা করে লঙ্কার কলঙ্ক দূর করার বাসনা প্রকাশ পেয়েছে।
উত্তরিলা বিভীষণ, “বৃথা এ সাধনা,
ধীমান! রাঘবদাস আমি, …
এতক্ষণ ধরে যে কথাগুলো বলা হয়েছে তা মেঘনাদের কথা। উক্ত লাইনগুলোতে বিভীষণের প্রতি মেঘনাদের অভিযোগগুলো উঠে এসেছে। এখন বিভীষণ মেঘনাদের কথাগুলোর উত্তর দিচ্ছে এ লাইনগুলোতে। বিভীষণ মেঘনাদকে বললো যে এ সাধনা বা চেষ্টা যেটি মেঘনাদ করছে সেটি সফল হবে না। ‘ধী’- মানে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা। ধীমান মানে হচ্ছে বুদ্ধিমান বা প্রাজ্ঞ। নিজেকে বিভীষণ ‘রাঘবদাস’ হিসাবে পরিচয় দেয় এখানে। ‘রাঘব’ মানে হচ্ছে রঘু বংশের শ্রেষ্ট সন্তান। এখানে রামকে বুঝানো হয়েছে। রাঘবদাস মানে হচ্ছে রামের দাস বা অনুগত।
… কী প্রকারে
তাহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” …
রাঘবের দাস হয়ে বিভীষণ কী করে মেঘনাদের অনুরোধ রক্ষা করতে রাঘব বা রামের বিরুদ্ধে কাজ করবে তা এ লাইনে জানতে চাওয়া হয়।
… উত্তরিলা কাতরে রাবণি; –
‘হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
‘রাবণি’ মানে হচ্ছে রাবণের সন্তান; এখানে মেঘনাদ। আর ‘পিতৃব্য’ মানে হচ্ছে পিতার ভাই বা চাচা। বিভীষণের মুখে নিজেকে রাঘবের দাস বলে পরিচয় দেওয়ার কথা শুনে মেঘনাদের মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তো দাসেরে!
মেঘনাদ বিভীষণের কাছে জানতে চাই কী করে তিনি নিজেকে রাঘবের দাস বলে পরিচয় দিতে পারলেন?
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধূলায়? …
‘স্থাপিলা’- মানে স্থাপন করা। ‘বিধু’ মানে চাঁদ। ‘বিধি’- মানে ঈশ্বর। ‘স্থাণু’-শব্দটির দুটি অর্থ হয়। স্থাণু বলতে মহাদেব বা শিবকে বুঝায়। আবার স্থাণু মানে হচ্ছে নিশ্চল বা স্থির। এখানে স্থাণু বলতে নিশ্চল আকাশকে বুঝানো হয়েছে। ‘ললাট’-শব্দের অর্থ কপাল। বিধুর মতো ‘শশী’- মানেও চাঁদ। ইশ্বর বা ভগবান নিশ্চল আকাশে চাঁদকে স্থাপন করেছেন। অর্থাৎ চাঁদকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। চাঁদ সেই মর্যাদা রক্ষা করে চলে। সে তার মর্যাদা ভুলে গিয়ে কখনো পৃথিবীর ধূলোবালিতে গড়াগড়ির খায় না।
… হে রক্ষোরথী, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জন্ম তব কোন মহাকুলে?
‘রথী’-শব্দের দুটি অর্থ হয়। যে রথে চড়ে রয়েছে তাকে রথী বলে। আবার ‘রথী’ মানে হচ্ছে বীরযোদ্ধা বা বীরপুরুষ। ‘রক্ষোরথী’- বলতে রক্ষস-বীরপুরুষ বুঝানো হয়েছে। এখানে বিভীষণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর আগের লাইনগুলোতে চাঁদের উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। চাঁদ কিন্তু নিজের মর্যাদা কখনো ভুলে না। কিন্তু বিভীষণ নিজের ব্যক্তি এবং বংশমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে নীচু জাতের রামের সাথে সখত্যা গড়েছে।
কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে খেলি রাজহংস পঙ্কজ-কাননে;
যায় কি সে কভু, প্রভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? …
চাঁদের মতোই মর্যাদার কথা বুঝাতে মেঘনাদ এখানে আরেকটি উপমা নিয়ে আসে। ‘স্বচ্ছ’- মানে পরিষ্কার। ‘সরোবর’- মানে হচ্ছে বড় পুকুর বা দিঘি। ‘রাজহংস’- মানে রাজহাঁস। ‘পঙ্ক’ মানে হচ্ছে কাদা। আর ‘পঙ্কজ’ মানে হচ্ছে কাদাতে জন্মে যা। এখানে পদ্ম ফুল অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘কানন’- মানে হচ্ছে বাগান। আগেই আমরা জেনেছি ‘পঙ্ক’ মানে হচ্ছে কাদা। তাহলে ‘পঙ্কিল’ –এর অর্থ দাঁড়ায় কর্দমাক্ত বা নোংড়া। ‘সলিল’- মানে হচ্ছে পানি বা জল। রাজহাঁস এখানে আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে ওঠে এসেছে। রাজহাঁস পদ্মফুল বেষ্টিত পরিষ্কার সরোবরে খেলা করে বেড়ায়। সে কখনো কাদা-মাখা, নোংড়া জলে যায় না।
… মৃগেন্দ্র কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরী’ সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? …
মৃগ+ইন্দ্র=মৃগেন্দ্র। ‘মৃগ’-মানে হচ্ছে পশু। আর ‘ইন্দ্র’ মানে হচ্ছে রাজা। মৃগেন্দ্র অর্থ হচ্ছে পশুদের রাজা মানে সিংহ। আবার কেশর আছে যার সেই কেশরী। সিংহের কেশর আছে তাই সিংহকে কেশরী বলা হচ্ছে। ‘সম্ভাষে’- মানে হচ্ছে সম্বোধন করে। ‘শৃগাল’- অর্থ শিয়াল। ‘মিত্রভাবে’- মানে বন্ধুর মতো। চাঁদ, রাজহাঁসের মতো এখানে সিংহও আভিজাত্যের প্রতীক। সিংহ তার আভিজাত্য বজায় রেখে চলে। সে কখনো তার আভিজত্যের কথা ভুলে গিয়ে শিয়ালকে বন্ধুর মতো সম্বোধন করে না।
…অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
‘অবিদিত’- অজানা। মেঘনাদের তুলনায় বিভীষণ বয়সে এবং জ্ঞানে অনেক বেশি ঋদ্ধ। যে কথাগুলো মেঘনাদ বলেছে সেগুলোর কোনোটি বিভীষণের অজানা নয়।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষ্মণ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
‘মতি’- মানে ‘মন’ হয় আবার ‘ইচ্ছা’ ও হয়। ‘ক্ষুদ্রমতি’- মানে এখানে ক্ষুদ্র, নীচু মনের মানুষ বুঝানো হয়েছে। ‘যোধ’- শব্দের অর্থ যোদ্ধা। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে পূজারত মেঘনাদকে অস্ত্রহীন অবস্থায় যুদ্ধে আহ্বান করে লক্ষ্মণ তার ছোটো মনের পরিচয় দিয়েছে।
কহ, মহরথী, এ কি মহারথীপ্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
এ কথা! ..
‘রথী”-মানে আমরা আগেই জেনেছি বীর। এখানে মহারথী বলতে বিভীষণকে বুঝানো হয়েছে। বীরের ধর্ম হলো নিরস্ত্র মানুষকে আক্রমণ না করা। লক্ষ্মণ নিরস্ত্র মেঘনাদকে আক্রমণ করে যে আচরণ করেছে সেটি কোনো মতেই মহাবীরপ্রথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। লঙ্কা নগরীতে এমন কোনো শিশু নেই যে এ কথা শুনে হাসবে না।
…ছাড়হ পথ; আসিব ফিরয়া
এখনি! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!
মেঘনাদ বিভীষণকে আবারও দরজা ছেড়ে দাঁড়ানোর অনুরোধ করে। মেঘনাদ অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র এনে লক্ষ্মণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে। ‘বিমুখ’- মানে হতাশ করা। এখানে পরাজিত করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুমিত্রা হচ্ছে লক্ষ্মণের মায়ের নাম। ‘সৌমিত্রি’- মানে হচ্ছে সুমিত্রার সন্তান। এখানে লক্ষ্মণকে বুঝানো হয়েছে। ‘মতি’- মানে ইচ্ছা। কুমতি অর্থ বদমতলবধারী; এখানেও লক্ষ্মণকে বুঝানো হয়েছে। কোন দেবতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে লক্ষ্মণ মেঘনাদের মতো বীরকে পরাজিত করবে সেটি মেঘনাদ জানতে চায়।
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের! কী দেখি
ডরিব এ দাস হেন দুর্বল মানবে?
বিভীষণ নিজের চোখেই দেবতা, দৈত্য ও মানুষের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে মেঘনাদের বীরত্ব দেখেছে। এখন মেঘনাদ লক্ষ্মণের মতো এমন একজন দুর্বল মানুষকে দেখে কেনো ভয় পাবে সেটিই বিভীষণের কাছে মেঘনাদের জিজ্ঞাসা?
নিকুম্ভুলিয়া যজ্ঞাগারে প্রগল্ভে পশিল
দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
বিভীষণের যজ্ঞাগারের নাম নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার। প্রগল্ভতা মানে হচ্ছে দাম্ভিকতা। ‘দম্ভী’ মানে হচ্ছে দম্ভ বা অহংকার আছে যার, এখানে লক্ষ্মণের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্মণ দাম্ভিকতা সহকারে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে লঙ্কার অপমান করেছে। তাই মেঘনাদ লক্ষ্মণকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? …
মেঘনাদের জন্মভূমি লঙ্কা বিভীষণেরও জন্মভূমি। রাম ও লক্ষ্মণরা নির্বাসনের কারণে দেশ ছাড়া হয়ে বনে বসবাস করতো। তাই লক্ষ্মণকে এখানে বনবাসী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। স্বর্ণ-লঙ্কায় একজন সাধারণ বনবাসী দাম্ভিকতা সহকারে প্রবেশ করে লঙ্কার আভিজাত্যেকে হেয় করেছে। ‘নন্দন’ মানে হচ্ছে স্বর্গ। ‘কানন’- অর্থ বাগান। ‘নন্দন-কানন’- অর্থ স্বর্গের বাগান। নিজ একটি সুন্দর বাগানে যদি একটি দৈত্য ঢুকে যায় তাহলে বাগানের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যায়। এখানে ‘নন্দন-কানন’ বলতে লঙ্কা নগরীকে বুঝানো হয়েছে। এবং ‘দুরাচার দৈত্য’-বলতে লক্ষ্মণের কথা বলা হয়েছে। বিধাতঃ মানে বিধান কর্তা। এখানে বিভীষণের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
…কহ, তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি, ভ্রাতৃপুত্র তব ?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে ?”
লঙ্কার এই অপমান মেঘনাদ সহ্য করতে পারছেন না। মেঘনাদের প্রশ্ন এই অপমান বিভীষণ কীভাবে সহ্য করছে।
মহামন্ত্রবলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে ;–
ফণী শব্দের অর্থ হচ্ছে সাপ। আত্মজ মানে হচ্ছে সন্তান বা ছেলে। মন্ত্রের প্রভাবে বা সাপুড়েদের বাঁশি শুনে সাপ যেমন তার মাথা নিচু করে ফেলে তেমনি মেঘনাদের কথা শুনে মাথা নিচু করে লজ্জ্বা পেয়ে বিভীষণ মেঘনাদকে লক্ষ করে অভিযোগগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা করে।
“নহি দোষী আমি, বৎস; বৃথা ভর্ৎস মোরে
তুমি ! নিজ কর্ম দোষে হায় মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি !
ভর্ৎস মানে হচ্ছে তিরষ্কার কর। বিভীষণের মতে সে দোষী নয়, তাকে অকারণেই তিরষ্কার করা হচ্ছে। আসল দোষ লঙ্কার রাজা রাবণের । লঙ্কার রাজা নিজ কর্মদোষে নিজ্যের রাজ্যকে ডুবিয়েছেন, নিজেও ডুবেছেন।
বিরত সতত পাপে দেবকুল ; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কা পুরী ; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কাল-সলিলে !
সতত মানে সবসময়। বসুধা মানে পৃথিবী। দেবতারা মানে রাম-লক্ষ্মণরা সবসময়ই পাপ মুক্ত; তারা কোনো ধরনের পাপে লিপ্ত হন না। অন্যদিকে লঙ্কাপুরী পাপে পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রলয় হলে যেমন পৃথিবী ডুবে যায় তেমনভাবে লঙ্কা পাপের স্রোতে ডুবে গেছে।
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি ! পরদোষে কে চাহে মজিতে ?”
রামদের বংশের নাম সূর্য বংশ। সেই বংশের একজন বিখ্যাত রাজা ছিলেন রঘু। তার নামানুসারে এই বংশকে রঘু বংশও বলা হয়। রাঘব শব্দের অর্থ হচ্ছে রঘু বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান । এখানে রামকে বোঝানো হয়েছে। নিজেকে রাঘব-দাস বা রামে দাস হিসাবে দাবি করে বিভীষণ বলে সে নিজেকে রক্ষার জন্য রামের পায়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যের দোষের শাস্তি কেউ ভোগ করতে চায় না।
রুষিলা বাসবত্রাস ! গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী ;–“ধর্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি ;–
বাসব ইন্দ্রের আরেক নাম। বাসবত্রাস বলে এখানে মেঘনাদকে সম্বোধন করা হয়েছে । রুষিলা মানে রুষে ওঠা, ক্ষুদ্ধ হওয়া। অম্বর মানে আকাশ। জীমূত মানে মেঘ। অনুজ মানে ছোট ভাই। রাক্ষসরাজানুজ মানে রাক্ষস রাজার ছোট ভাই। এখানে বিভীষণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিভীষণের কথা শুনে বিশেষ করে তার নিজেকে রাঘব-দাস পরিচয় দেওয়াতে মেঘনাদ ভীষণ ক্ষেপে উঠে। রাতের আকাশে মেঘ যেরকম গম্ভীর স্বরে গর্জে সেভাবে মেঘনাদ বিভীষণকে তিরষ্কার করে উঠে।
কোন্ ধর্মমতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,–এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি ?
ক্ষুদ্ধ মেঘনাদ বিভীষণের কাছে জানতে কোন ধর্ম মতে বিভীষণ তার পরিবার, তার দেশ, তার জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
…শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা !
এ শিক্ষা হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে ?
শাস্ত্রমতে গুণবান পরজন থেকে গুণহীন স্বজনই ভালো। পর সবসময়ই পর থাকবে। অনাত্মীয় রাম-লক্ষ্মণদের জন্য নিজের স্বজনদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই শিক্ষা বিভীষণ কোথায় পেয়েছে তা মেঘনাদের বোধগম্য হয় না।
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা ! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্বরত কেন না শিখিবে ?
গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি |”
পিতৃব্য মানে চাচা । মেঘনাদের সতর্ক বিনয় বচনে যে লাভাস্রোত নির্গত হয়েছে তা যে বিভীষণের কপালে কলঙ্ক-তিলক এঁকে দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এরপরও এখানে আমরা মেঘনাদের স্বদেশপ্রেমের যেমন পরিচয় পাই তেমনি তার দৃঢ় ব্যক্তিত্বেরও বহিঃপ্রকাশ আমার এখানে দেখতে পাই। তার মনের ভিতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। কিন্তু তারপরেও তার বক্তব্যে সংযম সে হারায় না। বরং শান্ত স্বরে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিভীষণকে তার ভণ্ডামি বুঝিয়ে দেয় সে। সে জানে বিভীষণকে তিরষ্কার করে কোনো লাভ নেই। নীচু লোকদের সাথে মিশে তার মন মানসিকতাও নীচু হয়ে গেছে।








