Be yourself; Everyone else is already taken.
— Oscar Wilde.
This is the first post on my new blog. I’m just getting this new blog going, so stay tuned for more. Subscribe below to get notified when I post new updates.
Be yourself; Everyone else is already taken.
— Oscar Wilde.
This is the first post on my new blog. I’m just getting this new blog going, so stay tuned for more. Subscribe below to get notified when I post new updates.
দত্ত, মাইকেল মধুসূদন (১৮২৪-১৮৭৩) মহাকবি, নাট্যকার, বাংলাভাষার সনেট প্রবর্তক, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে, এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে মধুসূদনের শিক্ষারম্ভ হয়। প্রথমে তিনি সাগরদাঁড়ির পাঠশালায় পড়াশোনা করেন। পরে সাত বছর বয়সে তিনি কলকাতা যান এবং খিদিরপুর স্কুলে দুবছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন।
হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালেই মধুসূদনের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮৩৪ সালে তিনি কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মধুসূদন উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কলেজের পরীক্ষায় তিনি সবসময় মেধার পরচিয় দেন। ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করনে এবং তাঁর নামের পূর্বে ‘মাইকেল’ শব্দটি যুক্ত হয়। কিন্তু হিন্দু কলেজে খ্রিস্টানদের অধ্যয়ন নিষিদ্ধ থাকায় মধুসূদনকে কলেজ ত্যাগ করতে হয়। তাই ১৮৪৪ সালে তিনি বিশপ্স কলেজে ভর্তি হন এবং ১৮৪৭ পর্যন্ত এখানে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখার সুযোগ পান।
এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর পিতাও এক সময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। অগত্যা মধুসূদন ভাগ্যান্বেষণে ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২) এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬) করেন।
মাদ্রাজের সঙ্গে মধুসূদনের জীবনের অনেক ঘটনা জড়িত। এখানেই তিনি সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি Eurasion (পরে Eastern Guardian), Madras Circulator and General Chronicle ও Hindu Chronicle পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং Madras Spectator-এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (১৮৪৮-১৮৫৬)। মাদ্রাজে অবস্থানকালেই Timothy Penpoem ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladie (১৮৪৮) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past প্রকাশিত হয়। রেবেকা ও হেনরিয়েটার সঙ্গে তাঁর যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ এখানেই সংঘটিত হয়। মাদ্রাজে বসেই তিনি হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা করেন।
এর মধ্যে মধুসূদনের পিতামাতা উভয়ের মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরিয়েটাকে নিয়ে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা আসেন। সেখানে তিনি প্রথমে পুলিশ কোর্টের কেরানি এবং পরে দোভাষীর কাজ করেন। এ সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেও তিনি প্রচুর অর্থোপার্জন করেন। তাঁর বন্ধুবান্ধবরা এ সময় তাঁকে বাংলায় সাহিত্যচর্চা করতে অনুরোধ জানান এবং তিনি নিজেও ভেতর থেকে এরূপ একটি তাগিদ অনুভব করেন। রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী (১৮৫৮) নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব অনুভব করেন এবং তাঁর মধ্যে তখন বাংলায় নাটক রচনার সংকল্প জাগে। এই সূত্রে তিনি কলকাতার পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এমন একটি পরিস্থিতিতে নাট্যকার হিসেবেই মধুসূদনের বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ ঘটে। তিনি মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে ১৮৫৮ সালে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। এটিই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক এবং একই অর্থে মধুসূদনও বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাট্যকার।
পরের বছর মধুসূদন রচনা করেন দুটি প্রহসন: একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। প্রথমটিতে তিনি ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলদের মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে কটাক্ষ করেন এবং দ্বিতীয়টিতে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আচারসর্বস্ব ও নীতিভ্রষ্ট সমাজপতিদের গোপন লাম্পট্য তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রেও মধুসূদন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রহসন দুটি কাহিনী, সংলাপ ও চরিত্রসৃষ্টির দিক থেকে আজও অতুলনীয়।
মধুসূদনের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি যাকিছু রচনা করেছেন তাতেই নতুনত্ব এনেছেন। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ বাংলা সাহিত্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেন। তখনকার বাংলা সাহিত্যে রচনার শৈলীগত এবং বিষয়ভাবনাগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তা অসাধারণ প্রতিভা ও দক্ষতাগুণে দূরীভূত করেন। ১৮৬০ সালে তিনি গ্রিক পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে রচনা করেন পদ্মাবতী নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার বরেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার এটাই প্রথম এবং এর ফলে তিনি বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহারে এই সফলতা তাঁকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করে এবং এই ছন্দে একই বছর তিনি রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। পরের বছর ১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনী নিয়ে একই ছন্দে তিনি রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি । এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। আর কোন রচনা না থাকলেও মধুসূদন এই একটি কাব্য লিখেই অমর হয়ে থাকতে পারতেন। এই কাব্যের মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন এবং তাঁর নব আবিষ্কৃত অমিত্রাক্ষর ছন্দও বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। রামায়ণে বর্ণিত অধর্মাচারী, অত্যাচারী ও পাপী রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক, বীর যোদ্ধা ও বিশাল শক্তির আধাররূপে চিত্রিত করে মধুসূদন উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা লাভ করেন। এক্ষেত্রে তিনি ভারতবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে প্রকৃত সত্য সন্ধান ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বাংলা সাহিত্যে তা তুলনাহীন।
মধুসূদনের কাব্যে এক ধরনের নারীবিদ্রোহের সুর লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যের নায়িকাদের মধ্য দিয়ে যেন যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত, আত্ম সুখ-দুঃখ প্রকাশে অনভ্যস্ত ও ভীত ভারতীয় নারীরা হঠাৎ আত্মসচেতন হয়ে জেগে ওঠে। তারা পুরুষের নিকট নিজেদের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং কামনা-বাসনা প্রকাশে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। তাঁর বীরাঙ্গনা (১৮৬২) পত্রকাব্যের নায়িকাদের দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। এখানে জনা, কৈকেয়ী, তারা প্রমুখ পৌরাণিক নারী তাদের স্বামী বা প্রেমিকদের নিকট নিজেদের কামনা-বাসনা ও চাওয়া-পাওয়ার কথা নির্ভীকচিত্তে প্রকাশ করে। নারীচরিত্রে এরূপ দৃঢ়তার প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের আগে আর কারও রচনায় প্রত্যক্ষ করা যায় না। মধুসূদনের এ সময়কার অপর দুটি রচনা হলো কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) ও ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১)। প্রথমটি রাজপুত উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত একটি বিয়োগান্তক নাটক এবং দ্বিতীয়টি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য। এ পর্বে মধুসূদন দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং কিছুদিন হিন্দু প্যাট্রিয়ট (১৮৬২) পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৮৬২ সালের ৯জুন মধুসূদন ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত যান এবং গ্রেজ-ইন-এ যোগদান করেন। সেখান থেকে ১৮৬৩ সালে তিনি প্যারিস হয়ে ভার্সাই নগরীতে যান এবং সেখানে প্রায় দুবছর অবস্থান করেন। ভার্সাইতে অবস্থানকালে তাঁর জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এখানে বসেই তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা ভাষায় এটিও এক বিস্ময়কর নতুন সৃষ্টি। এর আগে বাংলা ভাষায় সনেটের প্রচলন ছিল না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ভার্সাই নগরীতে থেকেই তিনি যেন মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে নতুনভাবে এবং একান্ত আপনভাবে দেখতে ও বুঝতে পারেন, যার চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘বঙ্গভাষা’, ‘কপোতাক্ষ নদ’ ইত্যাদি সনেটে। তাঁর এই সনেটগুলি ১৮৬৬ সালে চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী নামে প্রকাশিত হয়।
ভার্সাই নগরীতে দুবছর থাকার পর মধুসূদন ১৮৬৫ সালে পুনরায় ইংল্যান্ড যান এবং ১৮৬৬ সালে গ্রেজ-ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৬৭ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে ফিরে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় যোগ দেন। কিন্তু ওকালতিতে সুবিধে করতে না পেরে ১৮৭০ সালের জুন মাসে মাসিক এক হাজার টাকা বেতনে হাইকোর্টের অনুবাদ বিভাগে যোগদান করেন। দুবছর পর এ চাকরি ছেড়ে তিনি পুনরায় আইন ব্যবসা শুরু করেন। এবারে তিনি সফল হন, কিন্তু অমিতব্যয়িতার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অমিতব্যয়িতার ব্যাপারটি ছিল তাঁর স্বভাবগত। একই কারণে তিনি বিদেশে অবস্থানকালেও একবার বিপদগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং বিদ্যাসাগরের আনুকূল্যে সেবার উদ্ধার পান। ১৮৭২ সালে মধুসূদন কিছুদিন পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহ দেও-এর ম্যানেজার ছিলেন।
জীবনের এই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েও মধুসূদন কাব্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। হোমারের ইলিয়াড অবলম্বনে ১৮৭১ সালে তিনি রচনা করেন হেক্টরবধ। তাঁর শেষ রচনা মায়াকানন (১৮৭৩) নাটক। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর ১২টি গ্রন্থ এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ৫টি গ্রন্থ রয়েছে।
মধুসূদন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগপ্রবর্তক কবি। তিনি তাঁর কাব্যের বিষয় সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত সংস্কৃত কাব্য থেকে, কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ অনুযায়ী সমকালীন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী করে তিনি তা কাব্যে রূপায়িত করেন এবং তার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়। উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মধুসূদন তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভার দ্বারা বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি আবিষ্কার করে এই ভাষা ও সাহিত্যের যে উৎকর্ষ সাধন করেন, এরফলেই তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘মধুকবি’ নামে পরিচিত।
বাংলার এই মহান কবির শেষজীবন অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে কেটেছে। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। শেষজীবনে তিনি উত্তরপাড়ার জমিদারদের লাইব্রেরি ঘরে বসবাস করতেন। স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন বাংলার এই মহা কবি কপর্দকহীন অবস্থায় জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
মেঘনাদবধ কাব্য ১৯-শতকীয় বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কর্তৃক অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা একটি মহাকাব্য। এটি ১৮৬১ সালে দুই খণ্ডে বই আকারে প্রকাশিত হয়। কাব্যটি মোট নয়টি সর্গে বিভক্ত। মেঘনাদবধ কাব্য হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ অবলম্বনে রচিত, যদিও এর মধ্যে নানা বিদেশী মহাকাব্যের ছাপও সুস্পষ্ট।
গ্রিক রীতিতে হিন্দু পূরাণের কাহিনী অবলম্বন করে এই কাব্যটি রচিত। এর মূল উপজীব্য রামায়ণ। মধুসূদনের মেঘনাদ বধ কাব্য সর্বাংশে আর্য রামায়নকে অনুসরণ করে রচনা করেন নি। প্রতিটি চরিত্রের উপর বাল্মীকির থেকে ইংবেঙ্গলের প্রভাব অনেক বেশী৷ এটি অমিত্রাক্ষর ছন্দ বা ‘ফ্রি ভার্সে’ রচিত। অমিত্রাক্ষরে প্রথম রচনা করেন তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য(১৮৬০)। এরপর মেঘনাদ বধ কাব্য(১৮৬১) রচনা করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে।
“বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটুকু মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ‘বধো’ (বধ) নামক ষষ্ঠ সর্গ থেকে সংকলিত হয়েছে। সর্বমোট নয়টি সর্গে বিন্যস্ত ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে মৃত্যু ঘটে অসমসাহসী বীর মেঘনাদের।
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাল্মীকি-রামায়ণকে নবমূল্য দান করেছেন এ কাব্যে। মানবকেন্দ্রিকতাই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সারকথা। ওই নবজাগরণের প্রেরণাতেই রামায়ণের রাম-লক্ষ্মণ মধুসূদনের লেখনীতে হীনরূপে এবং রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদ যাবতীয় মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত। দেবতাদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত রাম-লক্ষ্মণ নয়, পুরাণের রাক্ষসর্জ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদের প্রতিই মধুসূদনের মমতা ও শ্রদ্ধা। “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি ১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। প্রথম পঙক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় পঙক্তির চরণান্তের মিলহীনতার কারণে এ ছন্দ ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ নামে সমধিক পরিচিত। এ কাব্যাংশের প্রতিটি পঙক্তি ১৪ মাত্রায় এবং ৮+৬ মাত্রার দুটি পর্বে বিন্যস্ত। লক্ষ করার বিষয় যে, এখানে দুই পঙক্তির চরণাধিক মিলই কেবল পরিহার করা হয়নি, যতিপাত বা বিরামচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহারও হয়েছে বিষয় বা বক্তব্যের অর্থের অনুষঙ্গে। এ কারণে ভাবপ্রকাশের প্রবহমানতাও কাব্যাংশটির ছন্দেরবিশেষ লক্ষ্মণ হিসেবে বিবেচ্য।
মেঘনাদ রাবণের পুত্র। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ মহাকাব্যের নায়ক। তাঁর দেশপ্রেম, বীরত্ব এবং পিতৃভক্তিই এ কাব্যের প্রধান উপজীব্য।
রাবণ মেঘনাদকে সঙ্গে নিয়ে দিগ্বিজয়ে বার হয়ে স্বর্গ আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে মেঘনাদের অস্ত্রাঘাতে ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত অজ্ঞান হয়ে পড়লে জয়ন্তর পিতামহ পুলোমা তাঁকে নিয়ে সকলের অজ্ঞাতে পালিয়ে যান। শোকে মুহ্যমান হয়ে ইন্দ্র রাবণকে অস্ত্রাঘাত করেন। ফলে রাবণ অজ্ঞান হয়ে যান। মেঘনাদ শিবের বরে মায়াপ্রভাবে অদৃশ্য অবস্থায় যুদ্ধ করে ইন্দ্রকে পরাভূত ও বন্দী করেন। ইতিমধ্যে রাবণের জ্ঞান ফেরে এবং তিনি ইন্দ্রকে লঙ্কায় বন্দী করে আনেন।
দেবতাদের অনুরোধে এক বছর বাদে ব্রহ্মা (হিন্দুদের প্রধান তিন দেবতার একজন) ইন্দ্রকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। তিনি মেঘনাদকে ইন্দ্রজিৎ নাম দেন এবং ইন্দ্রের মুক্তির প্রতিদানে মেঘনাদকে বরদান করতে চান। মেঘনাদ অমরত্বের বর চান। কিন্তু ব্রহ্মা তা দিতে রাজি হন না। তখন পরিবর্তে মেঘনাদ এই বর চান যে যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি ইষ্টদেব অগ্নির পূজা করবেন এবং অগ্নিসম্ভূত অশ্ব দ্বারা চালিত রথে যুদ্ধে গেলে তিনিই অজেয় হবেন; কিন্তু যজ্ঞ অসমাপ্ত রেখে যুদ্ধে গেলে তাঁর মৃত্যু হবে। এই বরের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মেঘনাদ নিজের বিক্রমে অমরত্ব চান। ব্রহ্মা তা মেনে নেন।
মেঘনাদ রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘটিত লঙ্কার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি যুদ্ধে গমন করার পূর্বে যজ্ঞানুষ্ঠান করতেন। এই যজ্ঞের বলে অজেয় হয়ে তিনি দুইবার রাম ও লক্ষ্মণকে পরাভূত করেন। কিন্তু তৃতীয় বারে বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ যজ্ঞাগারে উপস্থিত হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় তাঁকে বধ করেন।
বিভীষণ রাবণের ছোট ভাই। মেঘনাদের চাচা। তার বাবার নাম বিশ্রবা এবং মায়ের নাম নিকষা। লঙ্কার যুদ্ধের সময় বিভীষণ নিজ দেশ ও পরিবারের পক্ষ ত্যাগ করে রামের পক্ষে যোগদান করেন এবং ক্রমাগত বিভিন্ন ধরনের গোপন সংবাদ দিয়ে রাবণের পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে নিরস্ত্র মেঘনাদকে হত্যা করে। এখান থেকে “ঘরের শত্রু বিভীষণ” এই বাংলা বাগধারাটির উৎপত্তি। হিন্দ্য ধর্মে ও পুরাণে মেঘনাদকে পরম ধার্মিক হিসাবে চিত্রায়িত করা হলেও মধুসূদন তার কাব্যে বিভীষণকে চরম বিশ্বাসঘাতক, স্বার্থপর একজন মানুষ হিসাবেই তুলে ধরেছেন।
লক্ষ্মণ হলেন হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণের একটি চরিত্র। তিনি রামের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ে লক্ষ্মণকেও অবতার বা রামের অপর রূপ মনে করা হয়। আবার কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ে তাঁকে শেষনাগের অবতার মনে করা হয়।
অযোধ্যার রাজা দশরথের কনিষ্ঠা মহিষী সুমিত্রার দুই যমজ পুত্র হলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। তিনি রামের অত্যন্ত অনুগত ছিলেন। তিনি রামকে পিতার আদেশের বিরুদ্ধে বনগমনে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রাম বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে, লক্ষ্মণও তাঁর সঙ্গে বনে যান। বনবাসকালে তিনি একাধারে রামের ভাই, বন্ধু ও সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। লঙ্কার যুদ্ধে তিনি রাবণের পুত্র মেঘনাদকে বধ করেন।
রাবণ ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের অন্যতম প্রধান চরিত্র ও প্রধান খলনায়ক। তিনি মহাকাব্য ও পুরাণে বর্ণিত লঙ্কা (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) দ্বীপের রাজা। রামচন্দ্রের পত্নী সীতাকে হরণ করে তিনি লঙ্কায় নিয়ে যান। সীতার উদ্ধারকল্পে কিষ্কিন্ধ্যার বানরসেনার সাহায্যে রামচন্দ্র লঙ্কা আক্রমণ করলে রাবণের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। এই ঘটনা রামায়ণ মহাকাব্যের মূল উপজীব্য। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে তাঁর পূর্বজীবনের কথা বলা হয়েছে। রাবণের প্রকৃত নাম দশগ্রীব। তার রাবণ নামটি শিবের দেওয়া। জনপ্রিয় শিল্পে তার দশটি মাথা, দশটি হাত ও দশটি পা দর্শিত হয়। রামায়ণ মহাকাব্যে কামুক ও ধর্ষকামী বলে নিন্দিত হলেও মেঘনাদ বধ কাব্যে রাবণকে মহাজ্ঞানী, তাপস, দেশপ্রেমী বীর হিসাবেই চিত্রায়িত করা হয়েছে। উত্তর ভারতে দশেরা উৎসবে রাবণের কুশপুত্তলিকা দাহ আজও এক জনপ্রিয় প্রথা। রাবণ আদি যুগে সর্বপ্রথম মর্তে উড়ন্ত যান পুষ্পক রথ ব্যবহার করেন।
রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক। বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম ছিলেন রাজা দশরথ ও তাঁর জ্যৈষ্ঠা মহিষী কৌশল্যার জ্যৈষ্ঠ ও প্রিয়তম পুত্র। রামায়ণে রামকে মর্যাদা পুরুষোত্তম অর্থাৎ সর্বগুণের আধার বলে অভিহিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়া স্ত্রী কৈকেয়ীর চক্রান্তে দশরথ রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে যাওয়ার নির্দেশ দিতে বাধ্য হন। রামও পিতার আজ্ঞা শিরোধার্য করে বনবাসে গমন করেন।
কুম্ভকর্ণ রাবণের মধ্যম ভ্রাতা। বিশ্রবা মুনির ঔরসে সুমালী রাক্ষসের কন্যা কৈকসীর (নিকষা) গর্ভে তার জন্ম। লঙ্কার যুদ্ধে অসংখ্য রাম সৈন্য ও বানরদের হত্যা করার পরে রামের হাতে তার মৃত্যু হয়।
রামের প্রিয়তমা পত্নী এবং রাজা জনকের পালিতা কন্যা। সীতার অপর নাম জানকী। তিনি বিষ্ণুপত্নী দেবী লক্ষ্মীর অবতার। রামায়ণে তাঁকে নারীজাতির আদর্শস্থানীয়া বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি স্বামীর সঙ্গে বনবাসে গমন করেন। রাবণ তাঁকে অপহরণ করে লঙ্কায় বন্দী করে রাখেন। রাম রাবণকে পরাজিত করে তাঁকে উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে তিনি রামের দুই যমজ পুত্র লব ও কুশের জন্ম দেন।
অযোধ্যার রাজা ও রামের পিতা। তাঁর তিন পত্নী: কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা এবং রাম ব্যতীত অপর তিন পুত্র: ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। দশরথের প্রিয়তমা পত্নী কৈকেয়ী তাঁকে বাধ্য করেন রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে পাঠিয়ে ভরতকে যুবরাজ ঘোষণা করতে। রাম বনে গেলে পুত্রশোকে দশরথের মৃত্যু হয়।
অযোধ্যায় দশরথ নামে একজন রাজা ছিলেন। তার তিন’শরও বেশি রানী ছিলেন। কিন্তু এত রানীর মধ্যেও তিন রানীই ছিলেন প্রধান: বড় রানী কৌশল্যা, মেঝ রানী কৈকয়ী ও ছোট রানী সুমিত্রা। তার তিন রাণীর গর্ভে চার পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কৌশল্যার সন্তান ছিলেন রামচন্দ্র, কৈকয়ীর সন্তান ভরত এবং সুমিত্রার দুই জমজ সন্তান ছিলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন।
একবার দেবাসুরের যুদ্ধে দেবতাদের সাহায্য করতে গিয়ে দশরথ ভীষণরূপে আহত হন এবং কৈকয়ীর সেবায় ও যত্নে আরোগ্যলাভ করেন। সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে দশরথ কৈকয়ীকে দুইটি বরদানে প্রতিশ্রুত হন। রাবণ যখন তার বড় পুত্র রামকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন তখন ক্রুরমতি দাসী মন্থরার প্ররোচনায় কৈকয়ী দশরথের কাছে প্রতিশ্রুত এক বরে ভরতের রাজ্যলাভ এবং অন্য বরে রামে চৌদ্দো বছরের বনবাস প্রার্থনা করেন।
পিতৃসত্য রক্ষা করার জন্য রাম ১৪ বছরের বনবাসে চলে যান। তার সঙ্গী হন স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণ। এক আশ্রম থেকে অন্য আশ্রমে বাস করে রাম তার নির্বাসন জীবন যাপন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারা পঞ্চবটী নামের একটি বনে এসে উপস্থিত হন।
এ বনের পাশে ছিল সাগর আর সাগরের ওপারে ছিল রাক্ষসদের দেশ লঙ্কা রাজ্য যা শ্রীলঙ্কা বা স্বর্ণলঙ্কা নামে পরিচিত ছিল। সে রাজ্যের রাজা ছিলেন রাবণ। তার পিতার নাম ছিল বিশ্রবা এবং মায়ের নাম নিকষা। তার দুই ভাইয়ের নাম ছিল কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ। বোনের নাম শূর্পণখা।
পঞ্চবটীর বনে ঘুরতে এসে রাবণের বিধবা বোন শূর্পণখা রামের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে প্রণয় নিবেদন করলে রাম কর্তৃক প্রত্য্যাখাত ও বিতাড়িত হয়ে সীতাকে গ্রাস করবার চেষ্টা করে। রামের আদেশে লক্ষ্মণ এই রাক্ষসীর নাক ও কান কেটে দেন। শূর্পণখা তার অপমানের কথা রাবণকে জানায়। রাবণ বোনের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাড়কা রাক্ষসীর পুত্র মারীচকে সাথে নিয়ে পঞ্চবটীর বনে উপস্থিত হন। মায়াবী মারীচ স্বর্ণমৃগের রূপ ধারণ করে করে সীতার সম্মুখে ভ্রমণ করতে লাগল। সীতা তখন রামকে ঐ স্বর্ণমৃগ এন দিতে অনুরোধ করে। রাম ঐ স্বর্ণমৃগের অনুসরণ করে এবং এক পর্যায়ে তাকে শরাঘাত করে। শরবিদ্ধ মারীচ রামের স্বর অনুকরণ করে “হায় লক্ষ্মণ, হায় সীতা” বলে প্রাণত্যাগ করল। এই কাতরোক্তি শুনে রামের বিপদ আসন্ন ভেবে সীতা লক্ষ্মণকে রামকে সাহায্য করার জন্য প্রেরণ করে। এই সুযোগে রাবণ পরিব্রাজকবেশে এসে বলপূর্বক সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে আসেন।
সীতার শোকে তার স্বামী রাম ও দেবর দুজনেই পাগলের মতো হয়ে গেলেন। অবশেষে তারা জানতে পারলেন যে সমুদ্রের ওপারে লঙ্কা নামে একটি দ্বীপ আছে, সে দ্বীপে রাক্ষসদের বাস, তাদের রাজা রাবণ, তিনি-ই সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে গেছেন।
সীতাকে উদ্ধার করার জন্য রাম-লক্ষ্মণ হনুমান বাহিনী নিয়ে লঙ্কা আক্রমণ করে। তখন দুই পক্ষের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হয়। রাবণের ছোট ভাই বিভীষণ নিজ পক্ষ ত্যাগ করে রামের পক্ষাবলম্বন করে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাবণের মেজ ভাই কুম্ভকর্ণ এবং বড় ছেলে বীরবাহু নিহত হন। তখন রাবণ তার আরেক ছেলে মেঘনাদকে পরবর্তী দিনের যুদ্ধের সেনাপতি নির্বাচন করেন।
মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতার যজ্ঞ করতে থাকেন যাতে করে ব্রহ্মার প্রতিশ্রুত অগ্নিসম্ভূত অশ্ব দ্বারা চালিত রথ উত্থিত হয়। কিন্তু তার যজ্ঞপালনের মাঝখানে যজ্ঞাগারে রামের ভাই লক্ষ্মণ এসে হাজির হয় এবং নিরস্ত্র মেঘনাদকে যুদ্ধে আহ্বান করে। ইতোমধ্যে লক্ষ্মণ তলোয়ার কোষমুক্ত করলে মেঘনাদ যুদ্ধসাজ গ্রহণের জন্য সময় প্রার্থনা করে লক্ষ্মণের কাছে। কিন্তু লক্ষ্মণ তাকে সময় না দিয়ে আক্রমণ করে। তখন নিরস্ত্র মেঘনাদ তার পূজোর কোষা ছুড়ে লক্ষ্মণকে আক্রমণ করে এবং অজ্ঞান করে ফেলে। লক্ষ্মণের একক প্রয়াসে পথ চিনে যজ্ঞাগারে প্রবেশ নিয়ে নিরন্তর চিন্তা মেঘনাদকে অস্থির করে তুলে। মূর্চ্ছিত লক্ষ্মণকে যজ্ঞগৃহে রেখে অস্ত্র সন্ধানে মেঘনাদ যখন অস্ত্রাগারের দিকে ছোটে যায় তখন যজ্ঞগৃহে প্রহরারত বিভীষণকে দেখে যাবতীয় ধাঁধার অবসান হয়। মূহুর্তে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায় তার কাছে। খুল্লতাত বিভীষণকে প্রত্যক্ষ করে দেশপ্রেমিক নিরস্ত্র মেঘনাদ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, সেই নাটকীয় ভাষ্যই “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” অংশে সংকলিত হয়েছে।
“এতক্ষণে”-অরিন্দম কহিলা বিষাদে –
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষঃপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষোঃশ্রেষ্ট?
‘অরি’ মানে শত্রু। আর ‘অরিন্দম’ মানে হচ্ছে ‘শত্রুকে দমন করেন যে’। এখানে ‘অরিন্দম’ বলতে মেঘনাদকে বুঝানো হয়েছে। মেঘনাদ এতক্ষণ পর্যন্ত সকল কাজের মধ্যে একটি প্রশ্নের মীমাংসা খুঁজে বেড়িয়েছেন, লক্ষ্মণ কী করে পথ চিনে নিকুম্ভিলা যজ্ঞগৃহে পৌঁছাতে পারলেন। বিভীষণকে যজ্ঞগৃহের দরজায় পাহারারত অবস্থায় দেখে সব প্রশ্নের উত্তর জানা হল তাঁর। দেশশত্রু পিতৃব্যই খালা কেটে কুমীর ডেকে এনেছেন।
…শুলিশম্ভুনিভ
কুম্ভকর্ণ?
‘শূলপাণি’ মানে ‘শূল পাণিতে যার’। এখানে ‘পাণি’ অর্থ হচ্ছে হাত। শূলপাণি বলতে মহাদেবকে বুঝানো হয়েছে যেহেতু তিনি হাতে ত্রিশুল ধারণ করেন। হিন্দু পুরান থেকে আমরা জানি যে মহাদেবের প্রধান অস্ত্র ত্রিশুল, তার ধনুকের নাম পিনাক। আবার ‘শম্ভু’ও হচ্ছে মহাদেব বা শিবের আরেকটি নাম। ‘নিভ’ মানে হচ্ছে মতো। তাহলে ‘শূলিশম্ভুনিভ’ এর অর্থ দাঁড়ায় শূলপাণি মহাদেবের মতো।
ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী।
ভ্রাতৃপুত্র মানে ভাইয়ের ছেলে। এখানে বিভীষণের ভাই রাবণের সন্তান মেঘনাদের কথা বলা হয়েছে। ‘বাসব’ হচ্ছে দেবতা ইন্দ্রের আরেক নাম। যেহেতু মেঘনাদ যুদ্ধে ইন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন তাই তাকে ‘বাসববিজয়ী’ বলা হয়েছে। একই কারণে মেঘনাদের অপর নাম ইন্দ্রজিৎ।
নিজ গৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?
‘তাত’-শব্দের মূল অর্থ পিতা। এখানে চাচা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘তস্কর’ –শব্দের অর্থ চোর; এখানে লক্ষ্মণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিভীষণ নিজ রাজ্যের তথা ঘরের পথ লক্ষ্মণকে দেখিয়ে দিয়ে তাকে (লক্ষ্মণ) নিকুম্ভিলা যজ্ঞাঘারে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?
চণ্ডাল মানে হচ্ছে ছোট বা নীচু জাতের লোক। আলয় মানে হচ্ছে ঘর। রাজার আলয়ে অর্থাৎ রাবণের প্রাসাধে নীচু জাতের লক্ষ্মণকে আনার কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি
পিতৃতুল্য।…
বিভীষণের এই অনুচিত দেশবিরোধী কাজে উত্তেজিত দেশবাসীর সর্ব্বেন্দ্রীয় ধিক্কারে ও ক্রিয়াশীল প্রত্যাঘাতে মেঘনাদের অন্তর ফেটে পড়তে চাইছে। কিন্তু এমনই পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষা তাঁর যে বল প্রয়োগে বিভীষণকে হটানো তো দূরের কথা, কোনো দুর্বিনীত কটুবাক্য বা গালিগালাজ বর্ষণ থেকেও নিজেকে অপূর্ব ধীরতায় নিজেকে তিনি বিরত রাখলেন। এতকিছু করার পরও মেঘনাদ তার চাচা বিভীষণকে তিরষ্কার করে না। কারণ বিভীষণ মেঘনাদের পিতার ছোটো ভাই। তিনি গুরু জন, পিতার মতো।
…ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
মেঘনাদ বিভীষণকে অনুরোধ করে দরজা ছেড়ে দাঁড়ানোর জন্য। ‘দ্বার’-মানে হচ্ছে দরজা। ‘রামানুজ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে রাম + অনুজ এ দুটির শব্দের সন্ধির মাধ্যমে। ‘অনুজ’ মানে হচ্ছে ছোটো ভাই। এখানে রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণের কথা বলা হচ্ছে। আবার ‘শমন’ হচ্ছে যমরাজের অন্য নাম। ‘শমন-ভবন’ বা যমালয়ে পাঠানো মানে হচ্ছে হত্যা করা। এ লাইনে মেঘনাদ অস্ত্রগার থেকে অস্ত্র এনে লক্ষ্মণকে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।
‘ভঞ্জিব’-মানে দূর করবো। আর ‘আহব’-শব্দের অর্থ হচ্ছে যুদ্ধ। এখানে যুদ্ধ করে লক্ষ্মণকে হত্যা করে লঙ্কার কলঙ্ক দূর করার বাসনা প্রকাশ পেয়েছে।
উত্তরিলা বিভীষণ, “বৃথা এ সাধনা,
ধীমান! রাঘবদাস আমি, …
এতক্ষণ ধরে যে কথাগুলো বলা হয়েছে তা মেঘনাদের কথা। উক্ত লাইনগুলোতে বিভীষণের প্রতি মেঘনাদের অভিযোগগুলো উঠে এসেছে। এখন বিভীষণ মেঘনাদের কথাগুলোর উত্তর দিচ্ছে এ লাইনগুলোতে। বিভীষণ মেঘনাদকে বললো যে এ সাধনা বা চেষ্টা যেটি মেঘনাদ করছে সেটি সফল হবে না। ‘ধী’- মানে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা। ধীমান মানে হচ্ছে বুদ্ধিমান বা প্রাজ্ঞ। নিজেকে বিভীষণ ‘রাঘবদাস’ হিসাবে পরিচয় দেয় এখানে। ‘রাঘব’ মানে হচ্ছে রঘু বংশের শ্রেষ্ট সন্তান। এখানে রামকে বুঝানো হয়েছে। রাঘবদাস মানে হচ্ছে রামের দাস বা অনুগত।
… কী প্রকারে
তাহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে
অনুরোধ?” …
রাঘবের দাস হয়ে বিভীষণ কী করে মেঘনাদের অনুরোধ রক্ষা করতে রাঘব বা রামের বিরুদ্ধে কাজ করবে তা এ লাইনে জানতে চাওয়া হয়।
… উত্তরিলা কাতরে রাবণি; –
‘হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!
‘রাবণি’ মানে হচ্ছে রাবণের সন্তান; এখানে মেঘনাদ। আর ‘পিতৃব্য’ মানে হচ্ছে পিতার ভাই বা চাচা। বিভীষণের মুখে নিজেকে রাঘবের দাস বলে পরিচয় দেওয়ার কথা শুনে মেঘনাদের মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে
আনিলে এ কথা, তাত, কহ তো দাসেরে!
মেঘনাদ বিভীষণের কাছে জানতে চাই কী করে তিনি নিজেকে রাঘবের দাস বলে পরিচয় দিতে পারলেন?
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে;
পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি
ধূলায়? …
‘স্থাপিলা’- মানে স্থাপন করা। ‘বিধু’ মানে চাঁদ। ‘বিধি’- মানে ঈশ্বর। ‘স্থাণু’-শব্দটির দুটি অর্থ হয়। স্থাণু বলতে মহাদেব বা শিবকে বুঝায়। আবার স্থাণু মানে হচ্ছে নিশ্চল বা স্থির। এখানে স্থাণু বলতে নিশ্চল আকাশকে বুঝানো হয়েছে। ‘ললাট’-শব্দের অর্থ কপাল। বিধুর মতো ‘শশী’- মানেও চাঁদ। ইশ্বর বা ভগবান নিশ্চল আকাশে চাঁদকে স্থাপন করেছেন। অর্থাৎ চাঁদকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। চাঁদ সেই মর্যাদা রক্ষা করে চলে। সে তার মর্যাদা ভুলে গিয়ে কখনো পৃথিবীর ধূলোবালিতে গড়াগড়ির খায় না।
… হে রক্ষোরথী, ভুলিলে কেমনে
কে তুমি? জন্ম তব কোন মহাকুলে?
‘রথী’-শব্দের দুটি অর্থ হয়। যে রথে চড়ে রয়েছে তাকে রথী বলে। আবার ‘রথী’ মানে হচ্ছে বীরযোদ্ধা বা বীরপুরুষ। ‘রক্ষোরথী’- বলতে রক্ষস-বীরপুরুষ বুঝানো হয়েছে। এখানে বিভীষণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর আগের লাইনগুলোতে চাঁদের উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। চাঁদ কিন্তু নিজের মর্যাদা কখনো ভুলে না। কিন্তু বিভীষণ নিজের ব্যক্তি এবং বংশমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে নীচু জাতের রামের সাথে সখত্যা গড়েছে।
কে বা সে অধম রাম? স্বচ্ছ সরোবরে
করে খেলি রাজহংস পঙ্কজ-কাননে;
যায় কি সে কভু, প্রভু, পঙ্কিল সলিলে,
শৈবালদলের ধাম? …
চাঁদের মতোই মর্যাদার কথা বুঝাতে মেঘনাদ এখানে আরেকটি উপমা নিয়ে আসে। ‘স্বচ্ছ’- মানে পরিষ্কার। ‘সরোবর’- মানে হচ্ছে বড় পুকুর বা দিঘি। ‘রাজহংস’- মানে রাজহাঁস। ‘পঙ্ক’ মানে হচ্ছে কাদা। আর ‘পঙ্কজ’ মানে হচ্ছে কাদাতে জন্মে যা। এখানে পদ্ম ফুল অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘কানন’- মানে হচ্ছে বাগান। আগেই আমরা জেনেছি ‘পঙ্ক’ মানে হচ্ছে কাদা। তাহলে ‘পঙ্কিল’ –এর অর্থ দাঁড়ায় কর্দমাক্ত বা নোংড়া। ‘সলিল’- মানে হচ্ছে পানি বা জল। রাজহাঁস এখানে আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে ওঠে এসেছে। রাজহাঁস পদ্মফুল বেষ্টিত পরিষ্কার সরোবরে খেলা করে বেড়ায়। সে কখনো কাদা-মাখা, নোংড়া জলে যায় না।
… মৃগেন্দ্র কেশরী,
কবে, হে বীরকেশরী’ সম্ভাষে শৃগালে
মিত্রভাবে? …
মৃগ+ইন্দ্র=মৃগেন্দ্র। ‘মৃগ’-মানে হচ্ছে পশু। আর ‘ইন্দ্র’ মানে হচ্ছে রাজা। মৃগেন্দ্র অর্থ হচ্ছে পশুদের রাজা মানে সিংহ। আবার কেশর আছে যার সেই কেশরী। সিংহের কেশর আছে তাই সিংহকে কেশরী বলা হচ্ছে। ‘সম্ভাষে’- মানে হচ্ছে সম্বোধন করে। ‘শৃগাল’- অর্থ শিয়াল। ‘মিত্রভাবে’- মানে বন্ধুর মতো। চাঁদ, রাজহাঁসের মতো এখানে সিংহও আভিজাত্যের প্রতীক। সিংহ তার আভিজাত্য বজায় রেখে চলে। সে কখনো তার আভিজত্যের কথা ভুলে গিয়ে শিয়ালকে বন্ধুর মতো সম্বোধন করে না।
…অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,
অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।
‘অবিদিত’- অজানা। মেঘনাদের তুলনায় বিভীষণ বয়সে এবং জ্ঞানে অনেক বেশি ঋদ্ধ। যে কথাগুলো মেঘনাদ বলেছে সেগুলোর কোনোটি বিভীষণের অজানা নয়।
ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষ্মণ; নহিলে
অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?
‘মতি’- মানে ‘মন’ হয় আবার ‘ইচ্ছা’ ও হয়। ‘ক্ষুদ্রমতি’- মানে এখানে ক্ষুদ্র, নীচু মনের মানুষ বুঝানো হয়েছে। ‘যোধ’- শব্দের অর্থ যোদ্ধা। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে পূজারত মেঘনাদকে অস্ত্রহীন অবস্থায় যুদ্ধে আহ্বান করে লক্ষ্মণ তার ছোটো মনের পরিচয় দিয়েছে।
কহ, মহরথী, এ কি মহারথীপ্রথা?
নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে
এ কথা! ..
‘রথী”-মানে আমরা আগেই জেনেছি বীর। এখানে মহারথী বলতে বিভীষণকে বুঝানো হয়েছে। বীরের ধর্ম হলো নিরস্ত্র মানুষকে আক্রমণ না করা। লক্ষ্মণ নিরস্ত্র মেঘনাদকে আক্রমণ করে যে আচরণ করেছে সেটি কোনো মতেই মহাবীরপ্রথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। লঙ্কা নগরীতে এমন কোনো শিশু নেই যে এ কথা শুনে হাসবে না।
…ছাড়হ পথ; আসিব ফিরয়া
এখনি! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে,
বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!
মেঘনাদ বিভীষণকে আবারও দরজা ছেড়ে দাঁড়ানোর অনুরোধ করে। মেঘনাদ অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র এনে লক্ষ্মণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে। ‘বিমুখ’- মানে হতাশ করা। এখানে পরাজিত করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সুমিত্রা হচ্ছে লক্ষ্মণের মায়ের নাম। ‘সৌমিত্রি’- মানে হচ্ছে সুমিত্রার সন্তান। এখানে লক্ষ্মণকে বুঝানো হয়েছে। ‘মতি’- মানে ইচ্ছা। কুমতি অর্থ বদমতলবধারী; এখানেও লক্ষ্মণকে বুঝানো হয়েছে। কোন দেবতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে লক্ষ্মণ মেঘনাদের মতো বীরকে পরাজিত করবে সেটি মেঘনাদ জানতে চায়।
দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ,
রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের! কী দেখি
ডরিব এ দাস হেন দুর্বল মানবে?
বিভীষণ নিজের চোখেই দেবতা, দৈত্য ও মানুষের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে মেঘনাদের বীরত্ব দেখেছে। এখন মেঘনাদ লক্ষ্মণের মতো এমন একজন দুর্বল মানুষকে দেখে কেনো ভয় পাবে সেটিই বিভীষণের কাছে মেঘনাদের জিজ্ঞাসা?
নিকুম্ভুলিয়া যজ্ঞাগারে প্রগল্ভে পশিল
দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।
বিভীষণের যজ্ঞাগারের নাম নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার। প্রগল্ভতা মানে হচ্ছে দাম্ভিকতা। ‘দম্ভী’ মানে হচ্ছে দম্ভ বা অহংকার আছে যার, এখানে লক্ষ্মণের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্মণ দাম্ভিকতা সহকারে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে লঙ্কার অপমান করেছে। তাই মেঘনাদ লক্ষ্মণকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে।
তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে
বনবাসী! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে
ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে
কীটবাস? …
মেঘনাদের জন্মভূমি লঙ্কা বিভীষণেরও জন্মভূমি। রাম ও লক্ষ্মণরা নির্বাসনের কারণে দেশ ছাড়া হয়ে বনে বসবাস করতো। তাই লক্ষ্মণকে এখানে বনবাসী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। স্বর্ণ-লঙ্কায় একজন সাধারণ বনবাসী দাম্ভিকতা সহকারে প্রবেশ করে লঙ্কার আভিজাত্যেকে হেয় করেছে। ‘নন্দন’ মানে হচ্ছে স্বর্গ। ‘কানন’- অর্থ বাগান। ‘নন্দন-কানন’- অর্থ স্বর্গের বাগান। নিজ একটি সুন্দর বাগানে যদি একটি দৈত্য ঢুকে যায় তাহলে বাগানের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যায়। এখানে ‘নন্দন-কানন’ বলতে লঙ্কা নগরীকে বুঝানো হয়েছে। এবং ‘দুরাচার দৈত্য’-বলতে লক্ষ্মণের কথা বলা হয়েছে। বিধাতঃ মানে বিধান কর্তা। এখানে বিভীষণের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
…কহ, তাত, সহিব কেমনে
হেন অপমান আমি, ভ্রাতৃপুত্র তব ?
তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে ?”
লঙ্কার এই অপমান মেঘনাদ সহ্য করতে পারছেন না। মেঘনাদের প্রশ্ন এই অপমান বিভীষণ কীভাবে সহ্য করছে।
মহামন্ত্রবলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,
মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী
রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে ;–
ফণী শব্দের অর্থ হচ্ছে সাপ। আত্মজ মানে হচ্ছে সন্তান বা ছেলে। মন্ত্রের প্রভাবে বা সাপুড়েদের বাঁশি শুনে সাপ যেমন তার মাথা নিচু করে ফেলে তেমনি মেঘনাদের কথা শুনে মাথা নিচু করে লজ্জ্বা পেয়ে বিভীষণ মেঘনাদকে লক্ষ করে অভিযোগগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা করে।
“নহি দোষী আমি, বৎস; বৃথা ভর্ৎস মোরে
তুমি ! নিজ কর্ম দোষে হায় মজাইলা
এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি !
ভর্ৎস মানে হচ্ছে তিরষ্কার কর। বিভীষণের মতে সে দোষী নয়, তাকে অকারণেই তিরষ্কার করা হচ্ছে। আসল দোষ লঙ্কার রাজা রাবণের । লঙ্কার রাজা নিজ কর্মদোষে নিজ্যের রাজ্যকে ডুবিয়েছেন, নিজেও ডুবেছেন।
বিরত সতত পাপে দেবকুল ; এবে
পাপপূর্ণ লঙ্কা পুরী ; প্রলয়ে যেমতি
বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কাল-সলিলে !
সতত মানে সবসময়। বসুধা মানে পৃথিবী। দেবতারা মানে রাম-লক্ষ্মণরা সবসময়ই পাপ মুক্ত; তারা কোনো ধরনের পাপে লিপ্ত হন না। অন্যদিকে লঙ্কাপুরী পাপে পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রলয় হলে যেমন পৃথিবী ডুবে যায় তেমনভাবে লঙ্কা পাপের স্রোতে ডুবে গেছে।
রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী
তেঁই আমি ! পরদোষে কে চাহে মজিতে ?”
রামদের বংশের নাম সূর্য বংশ। সেই বংশের একজন বিখ্যাত রাজা ছিলেন রঘু। তার নামানুসারে এই বংশকে রঘু বংশও বলা হয়। রাঘব শব্দের অর্থ হচ্ছে রঘু বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান । এখানে রামকে বোঝানো হয়েছে। নিজেকে রাঘব-দাস বা রামে দাস হিসাবে দাবি করে বিভীষণ বলে সে নিজেকে রক্ষার জন্য রামের পায়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যের দোষের শাস্তি কেউ ভোগ করতে চায় না।
রুষিলা বাসবত্রাস ! গম্ভীরে যেমতি
নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,
কহিলা বীরেন্দ্র বলী ;–“ধর্মপথগামী,
হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে
তুমি ;–
বাসব ইন্দ্রের আরেক নাম। বাসবত্রাস বলে এখানে মেঘনাদকে সম্বোধন করা হয়েছে । রুষিলা মানে রুষে ওঠা, ক্ষুদ্ধ হওয়া। অম্বর মানে আকাশ। জীমূত মানে মেঘ। অনুজ মানে ছোট ভাই। রাক্ষসরাজানুজ মানে রাক্ষস রাজার ছোট ভাই। এখানে বিভীষণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিভীষণের কথা শুনে বিশেষ করে তার নিজেকে রাঘব-দাস পরিচয় দেওয়াতে মেঘনাদ ভীষণ ক্ষেপে উঠে। রাতের আকাশে মেঘ যেরকম গম্ভীর স্বরে গর্জে সেভাবে মেঘনাদ বিভীষণকে তিরষ্কার করে উঠে।
কোন্ ধর্মমতে, কহ দাসে, শুনি,
জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,–এ সকলে দিলা
জলাঞ্জলি ?
ক্ষুদ্ধ মেঘনাদ বিভীষণের কাছে জানতে কোন ধর্ম মতে বিভীষণ তার পরিবার, তার দেশ, তার জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
…শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি
পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি
নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা !
এ শিক্ষা হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে ?
শাস্ত্রমতে গুণবান পরজন থেকে গুণহীন স্বজনই ভালো। পর সবসময়ই পর থাকবে। অনাত্মীয় রাম-লক্ষ্মণদের জন্য নিজের স্বজনদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এই শিক্ষা বিভীষণ কোথায় পেয়েছে তা মেঘনাদের বোধগম্য হয় না।
কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা ! হেন সহবাসে,
হে পিতৃব্য, বর্বরত কেন না শিখিবে ?
গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি |”
পিতৃব্য মানে চাচা । মেঘনাদের সতর্ক বিনয় বচনে যে লাভাস্রোত নির্গত হয়েছে তা যে বিভীষণের কপালে কলঙ্ক-তিলক এঁকে দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এরপরও এখানে আমরা মেঘনাদের স্বদেশপ্রেমের যেমন পরিচয় পাই তেমনি তার দৃঢ় ব্যক্তিত্বেরও বহিঃপ্রকাশ আমার এখানে দেখতে পাই। তার মনের ভিতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। কিন্তু তারপরেও তার বক্তব্যে সংযম সে হারায় না। বরং শান্ত স্বরে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিভীষণকে তার ভণ্ডামি বুঝিয়ে দেয় সে। সে জানে বিভীষণকে তিরষ্কার করে কোনো লাভ নেই। নীচু লোকদের সাথে মিশে তার মন মানসিকতাও নীচু হয়ে গেছে।
বল বীর- বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
নেহারি শব্দের অর্থ দেখে। হিমালয়ের পর্বত শ্রেণিগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। হিমাদ্রি, হিমাচল ও শিবালিক। মহান হিমালয় বা হিমাদ্রি হল হিমালয় পর্বতমালার সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণী। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, মাউন্ট এভারেস্ট, সেইসাথে অন্যান্য “নিকট-সর্বোচ্চ” শৃঙ্গ, যেমন কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে এবং নাঙ্গা পর্বত, বৃহত্তর হিমালয় পর্বতের অংশ। এখানে কবি বলছেন কবির শির বা মাথা উন্নত বা উঁচু। কবির মাথা এত উঁচু যে তাঁর উঁচু মাথা দেখে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণি পর্যন্ত লজ্জ্বায় মাথা নিচু করে ফেলছে। এখানে আসলে কবির শারীরিক উচ্চতার কথা বলা হচ্ছে না; এখানে কবি মানসের বৃহত্তমতা, তাঁর অভ্রভেদী আত্মবিশ্বাসের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। একই ধরনের উচ্চারণ আমরা দেখতে পাই কবি হেলাল হাফিজের কবিতা রাখালের বাঁশি কবিতায়…
কে আছেন ?
দয়া করে আকাশকে একটু বলেন –
সে সামান্য উপরে উঠুক,
আমি দাঁড়াতে পারছি না ।
[রাখালের বাঁশি – হেলাল হাফিজ]
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত নৃশংস,
দুর্দম অর্থ যাকে সহজে দমন বা প্রতিরোধ করা যায় না, দুর্বিনীত অর্থ উদ্ধত, অবিনয়ী, অভদ্র; আর নৃশংস অর্থ ক্রূর, নিষ্ঠুর, হিংস্র। সম্পূর্ণ বিদ্রোহী কবিতায় কবি সাধারণ মানুষের পক্ষে পৃথিবীর সকল অন্যায়, অপশক্তি ও অসুন্দরের প্রতি লড়াই ঘোষণা করছেন। কবির এ সংগ্রামী সত্ত্বা সহজে দমন হবার নয়, কারও পেশিশক্তি বা হুমকির সামনে কবির সত্ত্বা মিইয়ে-পড়ার নয়। কবির তার এ লড়াই-এ যে কোনো প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ণ করতে প্রস্তুত। কোনো প্রকার ব্যক্তিগত বা সামাজিক সৌজন্যবোধ তাকে তাঁর কর্তব্য পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। কবির তার ‘আমার পথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আপাত অবিনয়ী হওয়া ব্যাখ্য দিয়ে লিখেছেন …
‘অনেক সময় খুব বেশি বিনয় দেখাতে গিয়ে নিজের সত্যকে অস্বীকার করে ফেলা হয়। ওতে মানুষকে ক্রমেই ছোটো করে ফেলে, মাথা নীচু করে আনে। ওরকম মেয়েলি বিনয়ের চেয়ে অহংকারের পৌরুষ অনেক – অনেক ভালো।’
[আমার পথ – কাজী নজরুল ইসলাম]
আর অন্যায়, অসুন্দর, পুরাতনকে ধ্বংস করে নতুনের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনেক সময় নিষ্ঠুর হতে হয়। কবিরগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ;নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ‘ন্যায়দণ্ড’ শীর্ষক কবিতায় খুব সুন্দর করে লিখেছেন…
“ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা তোমার আদেশে। যেন রসনায় মম
সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়্গসম
তোমার ইঙ্গিতে।”
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ,
আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,

নটরাজ শিবের অপর একটি নাম। মহাদেব বা শিব মহাপ্রলয়ের সময় তাণ্ডব নৃত্য নেচেছিলেন; গজাসুর ও কালাসুরকে বধ করেও তিনি তাণ্ডব নৃত্য নেচেছিলেন। এই তাণ্ডব নৃত্যকলার উদ্ভাবক হিসেবে তাকে নটরাজ ডাকা হয়। তাণ্ডব ও লাস্য এই দুই নৃত্যের সঙ্গে শিবের নাম জড়িত আছে। তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক এবং পুরুষালি নৃত্য ও লাস্য হলো তাণ্ডবের নারীসুলভ বিকল্প যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আনন্দ। তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য যথাক্রমে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক| পূরাণে কথিত আছে, শিব যখন ক্ষিপ্ত হন তখনই তার এই নটরাজ রূপ প্রকাশ্যে আসে, শিবের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই নৃত্যরত নটরাজ রূপের মাধ্যমে।
কবি নিজেকে নটরাজের সাথে তুলনা করেছেন কারণ কবি একই সাথে যা কিছু অসুন্দর, অশুভ সে সকল কিছু ধ্বংস করে দিতে পারেন, আবার সেই ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন সুন্দরের সৃজন করতে পারেন। একই সাথে তিনি ধ্বংস করার ও সৃজন করার অমিত শক্তিকে ধারণ করছেন।
আমি মহাভয়,আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!
আমরা জানি পৃথ্বী শব্দের অর্থ পৃথিবী কিন্তু যখন কবি বলেন, ‘আমি অভিশাপ পৃথ্বীর’ তখন এর অন্য কোনো ব্যঞ্জনা আছে কিনা তা কিছুটা অনুসন্ধান করে দেখা যায়। পৃথিবীর প্রথম রাজা ছিলেন পৃথু। রাজা অর্থ রঞ্জনকারী। অর্থাৎ যিনি মানুষের মনোরঞ্জন করতে পারেন বা মানুষকে আনন্দ দিতে পারেন তিনিই রাজা। পৃথুই সর্বপ্রথম মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু তখন মাটি ছিল অসমতল, পাথুরে, রুক্ষ। ফসল হত না। প্রজারা অভিযোগ করলো, যেটুকু ফসল হয় তাও পৃথ্বী খেয়ে ফেলে। পৃথু তখন পৃথ্বীকে শাস্তি দেবার জন্য ধাওয়া করেন। পরে পৃথ্বীকে তিনি এই শর্তে ক্ষমা করেন যে পৃথ্বী এই পৃথিবীকে উর্বর করে দেবেন। পৃথ্বী বলেন, সব শস্য খেয়ে আমার পেটের মধ্যে অনেক দুধ তৈরি হয়েছে। তুমি মাটিকে সমতল করো এবং একটি বাছুর নিয়ে আসো যাতে দুধ দোহন করতে পারো। সেই দুধ দিয়ে মাটি উর্বরা হবে। তখন স্বয়ম্ভুব মনু, যিনি ছিলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং শতরূপার স্বামী, নিজেই বাছুর হয়ে নেমে আসেন। পৃথু তার তির, বর্শা দিয়ে মাটিকে সমতল করে তোলেন। বাছুরের সাহায্যে দুধ দোহন করেন। সেই দুধ সমতলে ঢেলে দেন পৃথু। পৃথ্বীর ওলানের দুধ কিছুতেই শেষ হয় না। তখন দেবতা, রাক্ষস, মানব সকলেই পৃথ্বীর দুধ দোহন করে সমতলে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। এভাবেই মাটি উর্বরা হয়। পৃথুর নামের সাথে মিল রেখেই পৃথ্বীর নাম রাখা হয় এবং তার নামেই পৃথিবীর নাম হয়। পৃথ্বীর দুগ্ধে পৃথিবী উর্বরা হয়েছে বলেই পৃথ্বী বা পৃথিবীর নাম হয়েছে পৃথ্বী মাতা বা পৃথিবী মাতা।
আমি দুর্বার, আমি ভেঙে করি সব চুরমার! কবি একই কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীনার প্রথম কবিতা ‘প্রলয়োল্লাস’ শীর্ষক কবিতায় লিখছেন …
‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?- প্রলয় নতুন সৃজন- বেদন।
আসছে নবীন- জীবন- হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।
তাই সে এমন কেশে বেশে প্রলয় ব’য়েও আসছে হেসে—
মধুর হেসে !
ভেঙে আবার গ’ড়তে জানে
সে চির-সুন্দর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !’
[প্রলয়োল্লাস – কাজী নজরুল ইসলাম]
কবির এই আপাত ধ্বংস আসলে পুরাতন জীর্ণ সবকিছুকে দূর করে নতুন ও সুন্দর জন্য ভিত্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা।
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ‘লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!
কবি সমাজের, শাষকদের তৈরিকৃত সকল অনিয়ম, রীতি-নীতি ভেঙে সুন্দর সমাজের গোড়াপত্তন করবেন।
আমি মানি না কো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
ভীম পঞ্চপাণ্ডবের দ্বিতীয় পাণ্ডব। কথিত আছে তিনি ১০ হাজার হস্তিশক্তির অধিকারী ছিলেন। দুর্যোধন ভীমকে হত্যার উদ্দেশে বিষ প্রয়োগ করেন। পরে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে নদীতে ফেলে দেন। নদীতে ভাসমান ভীমকে রক্ষা করেন নাগরাজ বাসুকী। বাসুকী ভীমের বিষ শুষে নিলে ভীম আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন। মহাশক্তিধর ভীমের দেহ যখন নদীতে ভাসছিল তখন কবি তাকে কল্পনা করেছেন একটি ভাসমান মাইন হিসেবে।
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
বল বীর –
চির উন্নত মম শির!
‘ধূর‘ শব্দের অর্থ জটাভার বা ত্রিলোকের চিন্তাভার। শিব তার মাথায় জটাভার ধারণ করেন অথবা ত্রিলোকের চিন্তাভার ধারণ ও বহন করেন। এসকল ভার বহন ও ধারণের কারণে তারই নাম ধূর্জটি। নিজের দ্রোহী ধ্বংসত্মক রূপটি প্রকাশ করার জন্য কবি আবার নিজেকে শিবের অবতার রূপে উপস্থাপন করেছেন।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস,
আমি লোকালয়, আমি শ্মশান, আমি অবসান, নিশাবসান।
ঘুরে ফিরে কবির সেই সৃষ্টি ও ধ্বংসের আপাত বিপরীত সত্ত্বা ও শক্তির কথাই এখানে উঠে এসেছে। কবি ধ্বংস করেন, আবার সেই ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতেন। কবি অন্যায়, অবিচার, অসুন্দরের কবর রচনা যেমন করতে পারেন, আবার সেই হতোদ্যম নীরব শ্মশানে নতুনের, সুন্দরের, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করে লোকলয়ের জীবন কোলাহল আনতে পারেন। কবির অন্ধকার রাতের অবসান ঘটানো ভোরের সূর্যের মতো পৃথিবীতে নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে আসেন।
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য, মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য।
ইন্দ্রাণী শব্দের অর্থ ইন্দ্রের স্ত্রী। সূত অর্থ পুত্র। ইন্দ্রানী সূত হল ইন্দ্রের পুত্র। ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত হিন্দু পুরাণের একটি চরিত্র। তাকে প্রায়শই একজন দক্ষ যোদ্ধা হিসাবে চিত্রিত করা হয় এবং যুদ্ধে তার বীরত্ব ও পরাক্রমের জন্য পরিচিত। কবি নিজের দ্রোহী রূপ বোঝানোর জন্য জয়ন্তের উপমা দিয়েছেন। কবি তার হাতে চাঁদ এবং ললাটে সূর্যকে ধারণ করছেন। চাঁদ প্রেম ও সুন্দরের প্রতীক। অন্যদিক সূর্য একই সাথে উত্তাপ ও প্রাণের অমিত শক্তির প্রতীক। পরের লাইনে কবি আবার বলছেন কবি এক হাতে বাঁশি এবং অন্যহাতে যুদ্ধের বাদ্যযন্ত্র ধারণ করছেন। প্রেমময় স্নিগ্ধ চাঁদ, কঠোর নির্মম সূর্য; কৃষ্ণের প্রেমময় বাঁশি আবার ধ্বংসের রণতূর্য – কবি এই আপাত বিপরীত উপমাগুলো ব্যবহার করছেন কবির প্রেমিক ও দ্রোহী সত্ত্বাকে প্রকাশ করার জন্য। কবি যেমন সুন্দর সত্যকে প্রেমজ্ঞানে ধারণ করতে পারেন, বাঁশি বাজিয়ে তার বোধন করতে ও জয়গান গাইতে পারেন একই ভাবে অসুন্দর অসত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে তা ধ্বংস করে নতুনের সৃজনও করতে পারেন।আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
বেদুঈন আরবের একটি যাযাবর জাতি। সাধারণতঃ বেদুঈন লোকজন উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করেন। নিজেদেরকে তারা তাবুর লোক হিসেবে পরিচিয় দেন। কারণ, তারা এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরে অভ্যস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ জাতিগোষ্ঠী বাড়িতে বসবাস না করে সর্বত্র ঘুরে বেড়ান ও তাবুর নিচে বাস করেন। কবির অন্যায়-অসুন্দরের বিরুদ্ধের লড়াইয় সারা পৃথবী ব্যাপী লড়াই। কবি এ লড়াইয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেখানেই অসুন্দর ও অন্যায়ের বিকট রূপ দেখতে পান সেখানেই ছুটে যান।
কবি নিজের মাঝে বিধ্বংসী যোদ্ধা চেঙ্গিস খানকে কল্পনা করে নিজের বিদ্রোহ ও সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দিতে প্রয়াসী হয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নানা বিধ্বংসী চরিত্রকে অবলম্বন করে তাঁর দ্রোহের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। এক্ষেত্রে কখনো পুরাণ আবার কখনো ঐতিহাসিক অনুষঙ্গে ভর করে কবি তাঁর ধ্বংসকামী সত্তার পরিচয় জ্ঞাপন করেছেন। এরই অংশ হিসেবে কবি নিজেকে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল যোদ্ধা ও সেনাপতি চেঙ্গিস খানরূপে কল্পনা করেছেন। চেঙ্গিস খান অত্যন্ত নৃশংস ছিলেন। আলোচ্য কবিতায় কবি নিজেকে চেঙ্গিস খান রূপে কল্পনা করে মূলত অপশক্তি বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধাংদেহি রূপকে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমার পথ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন
‘নিজেকে চিনলে মানুষের মনে আপনা-আপনি এত বড়ো একটা জোর আসে যে, সে আপন সত্য ছাড়া আর কাউকে কুর্নিশ করে না – অর্থাৎ কেউ তাকে ভয় দেখিয়ে পদানত রাখতে পারে না। এই যে নিজেকে চেনা, আপনার সত্যকে আপনার গুরু, পথ-প্রদর্শক কাণ্ডারি বলে জানা, এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়। এটা আত্মকে চেনার সহজ স্বীকারোক্তি। আর যদিই এটাকে কেউ ভুল করে অহংকার বলে মনে করেন, তবু এটা মন্দের ভালো – অর্থাৎ মিথ্যা বিনয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভালো – লাখো গুণে ভালো।’
[আমার পথ – কাজী নজরুল ইসলাম]
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
ঈশান হিন্দু ভগবান শিবের এক নাম। বিষাণ অর্থ শিঙা। প্রলয়কালে তিনি বিষাণ ও ডমরু বাজিয়ে সব কিছু ধ্বংস করেন, তাই তাঁর অপর নাম মহাকাল। তবে ধ্বংস থেকেই আবার নতুন সৃষ্টির শুরু বলে শিবকে মঙ্গলের দেবতাও বলা হয়। শিব বিশ্ব পুরাণের একমাত্র চরিত্র, যাঁর মাঝে আছে ধ্বংস ও সৃষ্টির যুগল-অনুষঙ্গ। নজরুল তার ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘কারার ঐ লৌহকপাট‘ গানটিতে লিখেছেন…
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।
[কারার ঐ লৌহ-কপাট – কাজী নজরুল ইসলাম]
একইভাবে ইসলাম ধর্মানুসারে ইসরাফিল একজন ফেরেস্তা, যিনি কিয়ামত বা মহাপ্রলয় ঘোষণা করবেন। ইসলামের চারজন উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতার মধ্যে তিনি অন্যতম। ইসরাফিল আল্লাহর হুকুমে কিয়ামতের দিন ঘোষণা করার জন্য জেরুজালেমের একটি পবিত্র শিলা থেকে শিঙা বাজাবেন। শিবের বিষাণ ও ইস্রাফিলের শিঙ্গা দুটিই ধ্বংসের প্রতীক। কবির ধ্বংসাত্মক সত্ত্বাকে এভাবে উপমার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন এখানে।
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
শিবের ধনুকের নাম হলো পিনাক। পাণি মানে হাত। পিনাক-পাণি বলতে এখানে শিবকে বোঝানো হয়েছে। ডমরু ও ত্রিশূল শিবের অস্ত্র। শিবের ধনু এবং বাদ্যযন্ত্র পিনাক নামে পরিচিত। এর আকার ধনুকের মত। এটা একটি গুণবিশিষ্ট লাঠি। এর দুইপ্রান্ত তন্তু সহযোগে নীচুভাবে আবদ্ধ। মহাদেব এটা দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার শামিল ব্যবহার করতেন যেমন যুদ্ধের সময় শরনিক্ষেপ এবং অন্যসময় বাদ্যযন্ত্র। মনে করা হয় শিবের ত্রিশূলের তিনটি ফলা দ্বারা সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশকে বোঝায়।। ধর্মরাজ যমের অন্য নাম, যিনি নরকের অধীশ্বর দেবতা এবং দেবগনের মধ্যে সবচেয়ে পুন্যবান। দণ্ডের সাহায্যে ইনি জীবের প্রাণ সংহার করেন। কবি সকল অসুন্দরের ধ্বংস করার প্রয়াসী, তাই তিনি নিজেকে ধর্মরাজের দণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন।
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!

দেবতা বিষ্ণুর চার হাত। তাঁর এই চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। এখানে শঙ্খ মঙ্গলের প্রতীক। চক্র ও গদা বিধ্বংসী ক্ষমতার প্রতীক। এসকল অস্ত্র দিয়ে তিনি অপশক্তির বিনাশ ঘটিয়ে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। আলোচ্য কবিতায় শঙ্খ ও চক্রের সঙ্গে নিজের তুলনা করে কবি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন।
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
সনাতন ধর্মের ইতিহাসে যতো মুনি, ঋষি আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এবং আলাদা চরিত্রের ঋষি হিসেবে পরিচিত দুর্বাসা মুনি। দুর্বাসা শব্দের অর্থ হচ্ছে যার সাথে বাস করা যায় না। দুর্বাসা একজন মহৎ, সিদ্ধ এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে একদিকে যেমন তিনি ছিলেন নন্দিত, অন্যদিকে তিনি ছিলেন ভীতি উদ্রেককারী অভিশম্পাত প্রদানকারী ও প্রচণ্ড ক্রোধযুক্ত একজন ঋষি। তার ক্রোধাগ্নি থেকে রেহাই পাননি স্বয়ং দেবতারাও। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কারনে তিনি অত্যান্ত ক্রোধিত হতেন এবং ভয়ংকর অভিশাপ প্রদান করতেন। আর তাঁর সাধনার এমনই তেজ ছিলো যে, তার প্রদত্ত সকল অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হত। কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর উন্মত্ত্ব রূপটি বোঝানোর জন্য ক্ষ্যাপা দুর্বাসা মুনির উপমা ব্যবহার করেছেন।
অন্যদিকে বিশ্বামিত্র ছিলেন একজন ব্রহ্মর্ষি। ক্ষত্রিয়কূলে এঁর জন্ম কিন্তু কঠিন তপস্যায় ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন। কবির অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তার একনিষ্ঠতা উপস্থাপন করার জন্য বিশ্বামিত্রের শিষ্য হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!
দাবানল (Wildfire) হচ্ছে বনাঞ্চলে সংঘটিত একটি অনিয়ন্ত্রিত আগুন। প্রচণ্ড দাবদাহের কারণে অধিক ঘনত্বের বনে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। দাবানল আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর মনে হলেও এর ভেতর কিছু কল্যাণকর দিকও আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, মাঝে মাঝে আগুন না লাগলে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র (Natural Ecosystem) নষ্ট হয়ে যেতে চায়। মৃত ও পচনশীল দ্রব্যাদি পুড়ে গিয়ে শুদ্ধ হয় পরিবেশ, গাছের কাণ্ডে জমে থাকা পুষ্টি, অগ্নিকাণ্ডের পরে আবার ফেরত আসে জমিতে। যাবতীয় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধ্বংস হয় এতে, রোগশোকের জীবাণুও নষ্ট হয়ে যায়। উচুঁ গাছের শামিয়ানা পুড়ে গেলে অন্ধকার স্যাঁতসেতে বনের উঠানে সূর্যের আলো ঢুকে পড়ে। তখন ছাইয়ের গাদায় শুরু হয় নতুন জীবন। প্রথমে তৃণ, তারপর বড় গাছ এবং ক্রমশ নিবিড় অরণ্য। এভাবেই চলতে থাকে প্রাকৃতিক অগ্নি-চক্র। কবি পৃথিবীর সকল অসুন্দর ধ্বংস করে নতুনের সৃজনের পথ সুগম করবেন।
আমি উন্মন মন উদাসীর, আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর! আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের, আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা,
প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
পৃথিবীর সকল বঞ্চিত, নিপীড়িত, অবমানিত মানুষের মর্মবেদনা, রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, অভিমানকে কবি নিজের বিদ্রোহের উপাদান হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবিরগভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!
উত্তরের বাতাস বা উত্তর বায়ু প্রবাহিত হয় শীতকালে। শীতকালের এই বাতাশ শুষ্ক এবং কঠোর, মানুষকে তা নিষ্ক্রিয় করে তোলে, স্থবির করে দেয়। এই বাতাস প্রাণের স্পর্শবর্জিত, রসকষহীন সন্ন্যাস জীবনের মতো এই বাতাস জীবনানন্দ বঞ্চিত। রবীন্দ্রনাথের গানে আছে—
“উত্তর বায় জানায় শাসন,
পাতলো তপের শুষ্ক আসন।”
মলয়-অনিল বা মলয় বাতাস বয় বসন্তকালে। এই হাওয়া অতি সুস্নিগ্ধ, মানুষের জীবনকে সে ভরিয়ে তোলে, তাকে প্রাণচঞ্চল করে তোলে। উত্তরের হাওয়ার একেবারে বিপরীত এটি—জাঢ্য নয়, অস্থিরতা এবং চাঞ্চল্যই এর লক্ষণ। সংগীত শাস্ত্র মতে পূরবী রাগিণী উদাস এবং বৈরাগ্যের ভাব প্রকাশ করে। উদাস পূরবী হাওয়া বলতে কবি হাওয়ার সেই বৈরাগ্যের মূর্তিটিও বুঝিয়েছেন।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা,
আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর,
আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
নিদাঘ মানে গ্রীষ্মকাল। আরে নির্ঝর মানে ঝরনা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপ যেমন প্রকৃতির সবকিছু পুড়িয়ে দিয়ে ধ্বংস করে ফেলেন তেমনি কবি পৃথিবীর সকল অন্যায় অসুন্দরকে ধ্বংস করবেন। আবার গ্রীষ্মের তাপ জর্জরিত ধরণীতে যেমন বর্ষার বৃষ্টি নতুন প্রাণের সঞ্চার করে তেমনি কবি ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে নতুনের সৃজন করবেন।
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী, মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্
মম বাঁশরির তানে পাশরি‘ আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
‘অর্ফিয়াসের বাঁশি‘- গ্রীক পুরাণের সেই বাঁশি, যেই বাঁশি শুনে জীব জড় সবকিছু প্রাণ পেতো, নেচে উঠতো। বদলে যেতো নদীর গতিপথ। গাছপালা তার শিকড় ছিঁড়ে সামনে এগিয়ে আসতো, কেঁদে উঠতো পাথর। পুরাণে এমনও কাহিনী আছে যে, অর্ফিয়াসের বাঁশির সুর শুনে দেবতাদের যুদ্ধ থেমে গেছে। ঝরে যাওয়া ফুলেরা জীবন ফিরে পেয়ে হেসে উঠেছে। বাঙালি জাতিকে বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে জাগ্রত করার মানসে কবি গ্রিক পুরাণে উল্লিখিত মহান শিল্পী অর্ফিয়াসের বাঁশির সাথে নিজের তুলনা করেছেন। অর্ফিয়াস গ্রিক পুরাণের একজন মহান কবি ও শিল্পী। তিনি যন্ত্রসংগীতে সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। শুধু তাই নয়, সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে তিনি ভালোবাসার পাত্রী ইউরিডিসের মন জয় করেছিলেন। কবির প্রত্যাশা, অর্ফিয়াসের বাঁশির সুরের মতো তাঁর বিদ্রোহের সুরও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাবে। সে সুরে বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হবে দেশবাসী। মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। এমন ভাবনা থেকেই কবি নিজেকে অর্ফিয়াসের বাঁশি বলে অভিহিত করেছেন। শ্যাম মানে হচ্ছে কৃষ্ণ। একই ভাবে কবি নিজেকে শ্যামের বাঁশির সাথেও তুলন করেছেন।
আমি রুষে উঠে‘ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া, ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
এখানে সপ্ত নরক, হাবিয়া দোজখ পৃথিবীর অন্যায় অসুন্দরের রূপক। বিদ্রোহী কবি পৃথিবীর সকল অন্যায় অসুন্দর নির্মূল করবেন।
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
নিখিল শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ। আর অখিল শব্দের অর্থ বিশ্ব। অন্যায় ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে কবির এ বিদ্রোহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। সারা বিশ্বের মানুষ একদিন অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব,আনিব শান্তি শান্ত উদার!
ঋষি জমদগ্নি ও স্ত্রী রেণুকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে পরশুরাম ছিলেন কনিষ্ঠ সন্তান। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, একসময় সমাজে ক্ষত্রিয় রাজাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খুবই বেড়ে যায়। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সকলে ব্রক্ষা ও বিষ্ণুর কাছে অভিযোগ জানায়। ক্ষত্রিয়দের শায়েস্তা করার জন্য ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর বরে পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মহাদেবকে তুষ্ট করে পরশু অর্থাৎ কুঠার অস্ত্রটি লাভ করেন। সেই থেকে তার নাম হয় পরশুরাম। তার প্রকৃত নাম ছিল রাম। একুশবার তিনি পৃথিবী থেকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেন। পরশুরামে মতো কবি কঠোর হাতে পৃথিবীর অন্যায়-অসুন্দর নির্মূল করবেন।
আমি হল বলরাম স্কন্ধে, আমি উপাড়ি‘ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
বলরাম হলেন একজন হিন্দু দেবতা এবং শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা। তার অস্ত্র লাঙল বা হল। তাই তাঁকে “হলধর” ও বলা হয়।
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত! আমি চির-বিদ্রোহী বীর – বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা
চির-উন্নত শির!
নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের দুঃখকষ্ট ও আর্তচিৎকার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কবি বিপ্লব-প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন বোঝাতে তিনি উপরোক্ত কথা বলেছেন। অসাম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ নিরন্তর। যেখানেই তিনি অত্যাচার ও অনাচার দেখেছেন, সেখানেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন; নিপীড়কের বিরুদ্ধে এবং আর্তমানবতার পক্ষে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন তিনি। তাঁর হুংকারে কেঁপে উঠেছে অত্যাচারীর ক্ষমতার মসনদ। অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলেও উৎপীড়িত মানুষের পক্ষে বিপ্লব-প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করতেই তিনি উপরের চরণটির অবতারণা করেছেন।
শব্দার্থ
মম– আমার।
শির– মাথা।
নেহারি – দেখে।
হিমাদ্রি– হিমালয়।
নটরাজ– শিব, মহাদেব।
দুর্দম– দমন করা শক্ত এমন, দুর্দান্ত, দুরন্ত।
দুর্বিনীত– অবিনয়ী, উদ্ধত,অশিষ্ট।
নৃশংস– নির্দয়, নিষ্ঠুর,হিংস্র।
পৃথ্বী– পৃথিবী।
দুর্বার– নিবারণ করা বা বাধা দেওয়া শক্ত এমন, দুর্নিবার।
উচ্ছৃঙ্খল– শৃঙ্খলাহীন, শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত।
ভীম- পঞ্চপাণ্ডবের দ্বিতীয় পাণ্ডব। ভয়ঙ্কর।
ধূর্জটি– শিব, মহাদেব।
সূত– পুত্র।
শ্মশান– শবদাহের স্থান, মশান।
ভালে– কপালে।
রণতূর্য– রণশিঙ্গা, যুদ্ধঘোষণা বা যুদ্ধযাত্রার সময় যে শিঙ্গা বাজানো হতো।
ইশান – শিব, মহাদেব। উত্তর-পূর্বদিক।
বিষাণ– শিঙ্গা, বাঁশি।
হুঙ্কার– গর্জন, সিংহনাদ।
পিণাক– মহাদেব বা শিবের স্বর্গীয় ধনুক।
পিণাক-পানি – মহাদেব বা শিব।
ডমরু– ডুগডুগি। এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র।
ধর্মরাজ– যমরাজ।
প্রণব-নাদ– ওঁকার ধ্বনি।
দাবানল– বনের গাছে গাছে ঘর্ষণের ফলে যে আগুনের সৃষ্টি হয়, বন দহনকারী অগ্নি।
দাহন– দগ্ধকরণ, পোড়ানো,সন্তাপ সৃষ্টিকারী।
উন্মন– অন্যমনস্ক, উদাস।
পথবাসী– নিরাশ্রয়, পথেবাস করে এমন।
অবমানিত– অবহেলিত, অপমানিত, অসম্মানিত, পরিত্যক্ত।
মলয় অনিল – মলয় পর্বত থেকে আসা স্নিগ্ধ বাতাস।
বেণু বীণ – বাঁশ নির্মিত বাদ্যযন্ত্র, বাঁশের বাঁশি।
তিয়াসা – তৃষ্ণা, পিপাসা।
রৌদ্র রুদ্র রবি – সূর্যের উত্তপ্ত কিরণকে এখানে রৌদ্রদগ্ধ বা রবির ক্রুদ্ধ অবস্থা বোঝানো হয়েছে।
সিন্ধু উতলা – উত্তাল সাগর, ভাবাবেগে আকুল সাগর।
রুষে উঠি – রাগে খেপে উঠি।
নিখিল অখিল – সমগ্র বিশ্ব, সমুদয় সৃষ্টি।
উপাড়ি – উপড়ে ফেলে, উৎপাটিত করে।
ক্রন্দন রোল – কান্নার শব্দ, রোদন ধ্বনি।
রণভূম – যুদ্ধক্ষেত্র।
রণক্লান্ত– যুদ্ধে ক্লান্ত, যুদ্ধে অবসন্ন।
দশমিক সংখ্যাকে বাইনারি সংখ্যায় রূপান্তর করতে গেলে প্রথম দেখতে হবে সংখ্যাটি কি পূর্ণ সংখ্যা (integer Number), নাকি ভগ্নাংশ (Float Number), নাকি মিশ্র সংখ্যা (Mixed Number)। যদি পূর্ণ সংখ্যা হয় তবে Type 1 : A –এতে বর্ণিত উপায়ে দশমিক সংখ্যাটিকে বাইনারিতে রূপান্তর করতে হবে। আর যদি ভগ্নাংশ হয়ে তবে Type 1 : B অনুসরণ করতে হবে। আর যদি মিশ্র সংখ্যা হয় সে ক্ষেত্রে আমরা Type 1 : C –তে বর্ণিত ধাপগুলো অনুসরণ করে দশমিক সংখ্যাটিকে বাইনারিতে রূপান্তর করতে পারি।
সংখ্যা পদ্ধতি (Number System)
সাইফুজ্জামান খালেদ
কোনো কিছু গণনা করার জন্য কতিপয় সাংকেতিক চিহ্ণ ব্যবহার করে সংখ্যা লেখা বা প্রকাশ করার পদ্ধতিই সংখ্যা পদ্ধতি।
অঙ্ক (Digit)
কোনো সংখ্যা পদ্ধতিতে সংখ্যাগুলো লেখা বা প্রকাশ করার জন্য যে সাংকেতিক চিহ্ণ বা প্রতীক ব্যবহার করা হয় সে প্রতীকগুলোকে বলা হয় অঙ্ক। অর্থাৎ সংখ্যা তৈরির ক্ষুদ্রতম একক হচ্ছে অঙ্ক।
সংখ্যা (Number)
এক বা একাধিক অঙ্ক পাশাপাশি বসে সংখ্যা তৈরি করে। সংখ্যা এক অঙ্কের হতে পারে, আবার একাধিক অঙ্কেরও হতে পারে। যেমন ৭৮ একটি সংখ্যা। এটিতে ৭ ও ৮ এ দুটি অঙ্ক আছে।
ভিত্তি (Base)
কোনো সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি বলতে ঐ সংখ্যা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত মোট অঙ্ক বা প্রতীকসমূহের সংখ্যাকে বুঝায়।
সংখ্যা পদ্ধতির রূপান্তর
Type 1: দশমিক সংখ্যাকে বাইনারি সংখ্যায় রূপান্তর
দশমিক সংখ্যাকে বাইনারি সংখ্যায় রূপান্তর করতে গেলে প্রথম দেখতে হবে সংখ্যাটি কি পূর্ণ সংখ্যা (integer Number), নাকি ভগ্নাংশ (Float Number), নাকি মিশ্র সংখ্যা (Mixed Number)। যদি পূর্ণ সংখ্যা হয় তবে Type 1 : A –এতে বর্ণিত উপায়ে দশমিক সংখ্যাটিকে বাইনারিতে রূপান্তর করতে হবে। আর যদি ভগ্নাংশ হয়ে তবে Type 1 : B অনুসরণ করতে হবে। আর যদি মিশ্র সংখ্যা হয় সে ক্ষেত্রে আমরা Type 1 : C –তে বর্ণিত ধাপগুলো অনুসরণ করে দশমিক সংখ্যাটিকে বাইনারিতে রূপান্তর করতে পারি।

Type 1 : A (দশমিক পূর্ণ সংখ্যাকে অন্য সংখ্যা পদ্ধতিতে রূপান্তর)

Type 1 : B (দশমিক ভগ্নাংশকে অন্য সংখ্যা পদ্ধতিতে রূপান্তর)

Type 1 : C (মিশ্র দশমিক ভগ্নাংশকে অন্য সংখ্যা পদ্ধতিতে রূপান্তর)

Type 2: (অন্য সংখ্যা-পদ্ধতি হতে দশমিকসংখ্যা-পদ্ধতিতে রূপান্তর)

Type 3: (বাইনারি হতে অক্টাল/হেক্সা-ডেসিম্যালেরূপান্তর)

Type 4: (অক্টাল/হেক্সা-ডেসিম্যাল হতে বাইনারিতে রূপান্তর)

Type 5: (অক্টাল ও হেক্সা-ডেসিম্যাল সংখ্যা-পদ্ধতির মধ্যে পারস্পরিক রূপান্তর)
1’s Complement (১-এর পরিপূরক পদ্ধতি)
১-এর পরিপূরক বের করার নিয়ম:

মনে করি আমরা ১-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে -5 এর মান বের করবো। তাহলে আমাদের প্রথম ধাপ হচ্ছে +5 এর সমতুল্য বাইনারি সংখ্যাটি বের করা। আমরা জানি +5 এর বাইনারি সমতুল্য মান হচ্ছে 101. আমরা এই কাজে সাধারণত 8-বিট রেজিস্টার ব্যবহার করি। তাই সংখ্যাটির ডানে 5টি 0 (শূন্য) বসিয়ে একেও 8 বিটে উন্নীত করতে হবে। তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় 00000101। এবার প্রাপ্ত সংখ্যাটির প্রতিটি বিটকে উল্টিয়ে দিলে আমরা ১-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে 5 এর কপ্লিমেন্ট অর্থাৎ -5 এর মান পেয়ে যাব।
2’s Complement (২-এর পরিপূরক পদ্ধতি)
সংখ্যাটির অঙ্কগুলোকে অক্টালের
মনে করি আমরা ২-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে -5 এর মান বের করবো। তাহলে আমাদের প্রথম ধাপ হচ্ছে পূর্বের উদাহরণে বর্ণিত উপায়ে +5 এর 1’s Complement বের করা। এর পর উক্ত মানের সাথে 1 যোগ করলে যে নতুন বাইনারি সংখ্যাটি পাবো তাই হচ্ছে ২-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে 5 এর কপ্লিমেন্ট বা -5 এর মান।

পরিপূরক পদ্ধতিতে যোগ-বিয়োগ
পরিপূরক পদ্ধতিতে যোগ বিয়োগ করার সময় ধনাত্মক সংখ্যার প্রকৃত মান ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ঋণাত্মক সংখ্যার পরিপূরক মান ব্যবহার করা হয়। এর পর সংখ্যা দুটোকে যোগ করা হয়।
মনে রাখা দরকার যে পরিপূরক পদ্ধতিতে বিয়োগ করার প্রয়োজন হয় না কারণ গাণিতিক রাশি বা বাক্যটিকে সবসময় এমনভাবে প্রকাশ করে নিতে হয় যেন মাঝখানের Operator টি অবশ্যই যোগ হয়। এরপর যদি কোনো Operand-এর মান ঋণাত্মক হয় তবে সে সংখ্যাটির পরিপূরক মান ব্যবহার করতে হবে।
যেমন বলা হল +7 থেকে +5 বিয়োগ কর। তাহলে গাণিতিক এক্সপ্রেশনটি হবে:
7 – 5
এখানে মাঝখানের Operator টি হচ্ছে – (বিয়োগ)। কিন্তু এটাকে আমরা যদি এভাবে লিখি তাহলে মাঝখানের Operator টি (+) যোগ হয়ে যায়।
(+7) + (-5)
এখন -5 এর পরিপূরক মান ব্যবহার করে সংখ্যা দুটোকে যোগ করে নিতে হবে।
| প্রদত্ত যোগ / বিয়োগ | স্বাভাবিক গাণিতিক রাশি | সাজিয়ে লেখার পর গাণিতিক রাশি |
| +5 এর সাথে +6 বিয়োগ কর | 5 – 6 | 5 + (-6) |
| +8 থেকে -6 বিয়োগ কর | 8 – (-6) | 8 + 6 |
| -5 এর সাথে +6 যোগ কর | (-5) + 6 | (-5) + 6 |
| -5 থেকে -6 বিয়োগ কর | (-5) – (-6) | (-5) + 6 |
সাজিয়ে লেখার পর বাইনারির স্বাভাবিক নিয়মে আমরা খুব সহজে যোগ করতে পারি। শুধুমাত্র ঋণাত্মক সংখ্যার ক্ষেত্রে এর প্রকৃত মান ব্যবহার না করে পরিপূরক মান ব্যবহার করতে হবে।
১-এর পরিপূরক এবং ২-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে যোগ করার নিয়ম প্রায় একই। ১-এর পরিপূরক পদ্ধতি ঋণাত্মক সংখ্যার ১-এর পরিপূরক মান এবং ২-এর পরিপূরক পদ্ধতি ঋণাত্মক সংখ্যার ২-এর পরিপূরক মান ব্যবহার করা হয়। শুধুমাত্র পার্থক্যটি হয় যখন চূড়ান্ত যোগফলে carry হয়। তখন 8-bit রেজিস্টারের ক্ষেত্রে যোগফল হয় 9 বিটের। এই অতিরিক্ত ক্যারি বিটকে বলা হয় Carry Bit বা Overflow Bit. ১-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে Carry Bit-কে বাকি 8 বিটের সাথে আবার যোগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ২-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে Carry Bit-কে যোগ করতে হয় না।
Note: শুধুমাত্র ঋণাত্মক সংখ্যার পরিপূরক মান বের করতে হয়। ধনাত্মক সংখ্যার পরিপূরক মান বের করতে হয় না।
পরিপূরক পদ্ধতিতে যোগ-বিয়োগ করার নিয়ম:
ধনাত্মক সংখ্যার ক্ষেত্রে প্রকৃত মান এবং ঋণাত্মক সংখ্যার ক্ষেত্রে পরিপূরক মান ব্যবহার করতে হবে।
উদাহরণ: পরিপূরক পদ্ধতি +7 এর সাথে +5 যোগ কর।
তার মানে গাণিতিক রাশিটি হচ্ছে –
7 – 5
আমাদের প্রথম কাজটি হবে গাণিতিক রাশিটিকে সাজিয়ে লেখা। সাজিয়ে লিখলে গাণিতিক রাশিটি দাঁড়ায়
(-5) + (+7)
Note: সাজিয়ে লেখার সময় ঋণাত্মক সংখ্যাটিকে আগে লিখলে যোগ করতে সুবিধে হবে।
সৃজনশীল নমুনা প্রশ্ন
০১. প্রথম দিকে কিছু অসুবিধা হলেও বর্তমানে আইসিটি ক্লাস ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুব উপভোগ্য। শ্রেণি শিক্ষক মিজান ও সুমনকে তাদের বয়স বোর্ডে লিখতে বললে তার লিখল (25)8 ও (10100)2। শিক্ষকও মজা করে বললেন, আমার বয়স তোমাদের দুই জনের বয়সের যোগফল অপেক্ষা (11)10 বছর বেশি।
ক. সংখ্যা পদ্ধতি কী?
খ. পৃথিবীর সকল ভাষাকে কোন কোডের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব – ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের মিজান ও সুমনের বয়সের যোগফল দশমিক পদ্ধতিতে নির্ণয় কর।
ঘ. তোমার বাবার বয়স পঞ্চাশ বছর হলে, তোমার বাবা ও উদ্দীপকের শিক্ষক, কে বয়সে বড় – বিশ্লেষণ করে দেখাও।
০২. মামুন ও পান্না সংখ্যা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলছে। মামুন বলছে কম্পিউটার আসলে একটি যন্ত্র যেটি দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি চেনে না। সে শুধু চেনে বাইনারি সংখ্যা আর বাইনারি সংখ্যার ডিজিট হলে ০ এবং ১। পান্না বলল এ দুটি প্রতীক দিয়ে কি যে কোনো সংখ্যা লেখা যায়? তাহলে 405 কে বাইনারিতে কীভাবে লেখা যাবে।
ক. সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি বলতে কী বুঝ?
খ. বিভিন্ন প্রকার সংখ্যা পদ্ধতি উল্লেখ কর।
গ. পান্নার বলা সংখ্যাটিকে বাইনারিতে প্রকাশ কর।
ঘ. কম্পিউটার ডিজাইনে উদ্দীপকে বর্ণিত সংখ্যা পদ্ধতিটি ব্যবহার করার কারণ বিশ্লেষণ কর।
০৩. সাদীয়া (১২৩.৪)৮ টাকায় (৩২)১০ টি লিচু ক্রয় করল। তার মধ্যে (১৪)১০ টি লিচু জেরিন খেয়ে ফেলল।
ক. ঋণাত্মক সংখ্যার প্রচলন শুরু হয় কবে?
খ. বিসিডি ও বাইনারি কোড এক নয় – ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের লিচুর ক্রয়মূল্যকে দশমিকে প্রকাশ কর।
ঘ. উদ্দীপকের আলোকে ২-এর পরিপূরক পদ্ধতিতে অবশিষ্ট লিচুর সংখ্যা নির্ণয় কর।
০৪. আধুনিক কম্পিউটারের গাণিতিক বর্তনিতে ২-এর পরিপূরক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ২-এর পরিপূরক গঠনে ঋণাত্মক সংখ্যা প্রকাশ করার জন্য প্রথম চিহ্ণ বিট ১ হবে বলে রহিম করিমকে জানালো। তখন করিম বলল তাহলে কি ধনাত্মক সংখ্যা প্রকাশ করার প্রথমে চিহ্ণ ০ হবে?
ক. ১ এর পরিপূরক কত?
খ. বাইনারি পদ্ধতিতে চিহ্ণ বোঝানোর জন্য কী ব্যবহার করা হয়? ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের আলোকে উপরোক্ত পরিপূরক পদ্ধতিতে (25)10 ও (13)10 যোগ কর।
ঘ. উদ্দীপকের পরিপূরক গঠনের গুরুত্ব বিশ্লেষণ কর।
০৫. (425)10 (425)8
ক. র্যাডিক্স পয়েন্ট কী?
খ. দশমিক ও অক্ট্যাল সংখ্যা পদ্ধতির মধ্যে প্রধান পার্থক্য বুঝিয়ে লেখ।
গ. প্রথম সংখ্যাটিকে অক্ট্যালে রূপান্তর কর।
ঘ. দ্বিতীয় সংখ্যাটিকে দশমিকে রূপান্তর করে প্রথম সংখ্যার সাথে যোগ করে যোগফলকে বাইনারিতে প্রকাশ কর।
বাংলা বানানের নিয়ম
(একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি)
সাইফুজ্জামান খালেদ
বানানে কী ভুল করি, কেনো ভুল করি?
বানান লিখার সময় আমরা যে ভুলগুলো করি এবং তা করার কারণ নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
ণত্ব-বিধান
বাংলা শব্দের বানানে দন্ত্য-ন পরিবর্তিত হয়ে কখন মূর্ধন্য-ণ হয়ে যায়, এই নিয়মের নামই হল ণত্ব বিধান।
১. সাধারণত ‘র’, ‘ষ’, ‘ক্ষ’ – এই তিন অক্ষরের পর মূর্ধন্য-ণ ব্যবহৃত হবে। (‘র’ অর্থ ১.র ২.ঋ ৩.রেফ্ ৪.র-ফলা ৫.ঋ-কার)।
উদাহরণ: প্রাণ, কারণ, ধারণ, ঘৃণা, তৃণ, ষণ্ড, ভূষণ, ক্ষণ ইত্যাদি।
২. ‘র’ অথবা ‘ক্ষ’ এরপর যদি
ক-বর্গের ৫টি (ক খ গ ঘ ঙ)
প-বর্গের ৫টি (প ফ ব ভ ম) এবং য য় হ
এই মোট ১৩টি অক্ষরের যে-কোনো ১টি বা ২টি অক্ষর আসে, তবে তার পরেও মূর্ধন্য-ণ হবে।
উদাহরণ: পরায়ণ, গ্রহণ, কৃপণ, ভ্রাম্যমাণ ইত্যাদি।
৩. ট-বর্গের ট ঠ ড ঢ-এই চারটি বর্ণের পূর্বে যদি ‘ন্’ ধ্বনি থাকে এবং ঐ ‘ন্’ সহযোগে যদি যুক্তবর্ণ তৈরি হয়, তা হলে সর্বদা মূর্ধন্য-ণ হবে। যেমন: কণ্টক, ঘণ্টা, ঠাণ্ডা, দণ্ড, লণ্ঠন ইত্যাদি।
৪. ত-বর্গের ত থ দ ধ-এই চারটি বর্ণের পূর্বে যদি ‘ন্’ ধ্বনি থাকে এবং ঐ ‘ন্’ সহযোগে যদি যুক্তবর্ণ তৈরি হয়, তা হলে সর্বদা দন্ত্য-ন হবে। যেমন: অন্ত, ছন্দ, বন্দি, গন্ধ ইত্যাদি।
৫. এই ণত্ব-বিধান বিদেশী শব্দ বা বিদেশী নামের বানানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় । যেমন: গ্রিন (গ্রিণ নয়)।
৬. সমাসবদ্ধ দুই পদেরই অর্থের প্রাধান্য থাকায় নিম্নের শব্দগুলোর ক্ষেত্রে ‘মূর্ধন্য-ণ’র পরিবর্তে ‘দন্ত্য-ন’ ব্যবহৃত হবে।
যেমন: ত্রিনয়ন, দুর্নীতি, সর্বনাম ইত্যাদি।
৭. খাঁটি বাংলা শব্দে ও অ-তৎসম শব্দে (অর্থাৎ তদ্ভব শব্দে) সর্বদা দন্ত্য-ন হবে। যেমন: ঝরনা, রানী, পুরান ইত্যাদি।
ষত্ব-বিধান
বাংলা শব্দের বানানে দন্ত্য-স পরিবর্তিত হয়ে কখন মূর্ধন্য-ষ হয়ে যায়, এই নিয়মের নামই হল ষত্ব বিধান।
১. অ আ এবং অ-কার ছাড়া অন্যান্য স্বরবর্ণের পরে বহু ক্ষেত্রে ষ হয়ে থাকে।
অর্থাৎ ই, ঈ উ ঊ এ ঐ ও ঔ এবং হ্রস্ব- ই, দীর্ঘ-ঈ, হ্রস্ব-উ, দীর্ঘ-ঊ, এ-কার, ঐ-কার, ও-কার, ঔ-কার –এদের পরে ষ হয়:
ই | ঈ | উ | ঊ | এ | ঐ | ও | ঔ |
| ইষণ ইষু বিষয় ভবিষ্যৎ | ঈষ ইষৎ ভীষণ জিগীষা | উষ্ণ সুষম তুষার মঞ্জুষা | উষর ঊষা ভূষণ দূষণ | এষণ এষা দ্বেষ বিশেষ | ঐষিক বৈষ্ণব | ওষধি ওষুধ পোষণ কোষাধ্যক্ষ | ঔষধ পৌষ কৌষেয় |
২. সন্ধির ক্ষেত্রে প্রথম পদে ‘হ্রস্ব-ই + বিসর্গ’ বা ‘হ্রস্ব-উ + বিসর্গ’ থাকলে এবং দ্বিতীয় পদের শুরুতে ক খ প ফ থাকলে সন্ধির ফলে বিসর্গের জায়গায় সর্বদা মূর্ধন্য-ষ বসবে। যথা:
| আবিঃ+কার = আবিষ্কার নিঃ+পত্র = নিষ্পত্র আয়ু + কাল = আয়ুষ্কাল | পরিঃ+কার = পরিষ্কার নিঃ + প্রদীপ = নিষ্প্রদীপ দুঃ + কর = দুষ্কর | নিঃ+ক্রিয় = নিষ্ক্রিয় নিঃ + ফল = নিষ্ফল চতুঃ + পদ = চতুষ্পদ |
৩. রেফ্ বা ঋ-কারের পরে সর্বদা মূর্ধন্য-ষ হবে। যথা: কর্ষণ, বর্ষা, মহর্ষি, ঋষি, বৃষ, তৃষা, তৃষ্ণা।
৪. ট ঠ-এই দুটি বর্ণের পূর্বে সর্বদা মূর্ধন্য-ষ হবে। অর্থাৎ, যুক্তাক্ষরের রূপ হবে ষ্ট/ষ্ঠ। যথা: অনিষ্ট, ওষ্ঠ, নষ্ট, বলিষ্ঠ।
৫. বাংলা ভাষায় দেশি-বিদেশী শব্দ মিলে ৫০টিরও বেশি উপসর্গ আছে। এ-সব উপসর্গের মধ্যে ই-কারন্ত (অর্থাৎ হ্রস্ব-ই দিয়ে শেষ হচ্ছে যেগুলো – অধি অভি প্রতি পরি ইত্যাদি) এবং উ-কারন্ত (যেমন – অনু সু ইত্যাদি) উপসর্গের পরে মূর্ধন্য-ষ হবে। যথা:
| অভিষেক (অভি+সেক) প্রতিষ্ঠান (প্রতি+স্থান) | অনুষঙ্গ =(অনু+সঙ্গ) অনুষ্ঠান (অনু + স্থান) | সুষম (সু+সম) |
৬. বিদেশী শব্দে কখনোই ‘মূর্ধন্য-ষ’ হবে না। যথা: মজলিস, স্যার, মেশিন, চশমা, সিলেবাস ইত্যাদি।
তৎসম শব্দের বানানের কিছু নিয়ম
১. যেসব তৎসম শব্দে ‘হ্রস্ব ই-কার’, ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ বা ‘হ্রস্ব উ-কার’, ‘দীর্ঘ ঊ-কার’ উভয় শুদ্ধ, সেসব শব্দে শুধুমাত্র ‘হ্রস্ব ই-কার’ এবং’ হ্রস্ব উ-কার’ হবে । যেমন : কিংবদন্তি, খঞ্জনি, চিৎকার, চুল্লি, তরণি, ধমনি, নাড়ি, পঞ্জি, পদবি, পল্লি, ভঙ্গি, মঞ্জরি, মসি, যুবতি,রচনাবলি, লহরি, শ্রেণি, সরণি, সূচিপত্র,উর্ণা, ঊষা ।
২. রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না । যেমন : অর্জ্জন, ঊর্দ্ধ্ব, কর্ম্ম, কার্ত্তিক, কার্য্য, বার্দ্ধক্য, মূর্চ্ছা,সূর্য্য ইত্যাদির পরিবর্তে যথাক্রমে অর্জন,ঊর্ধ্ব, কর্ম, কার্তিক, কার্য, বার্ধক্য, মূৰ্ছা, সূর্য ইত্যাদি হবে।
৩. তৎসম শব্দ নারীবাচক হলে শেষে ‘দীর্ঘ ই-কার’ হবে। যেমন: কল্যানী, সুন্দরী, মানবী, তরুণী।
৪. সন্ধির ক্ষেত্রে প্রথম পদে ‘ম্’ থাকলে ক-বর্গের পূর্বে অন্তঃস্থিত ‘ম্’-এর স্থানে অনুস্বার (ং) হবে ।
যেমন : – অহম্ + কার = অহংকার। এভাবে ভয়ংকর, সংগীত, শুভংকর, হৃদয়ংগম, সংঘটন।
সন্ধিবদ্ধ না হলে ঙ স্থানে (ং) হবে না।
যেমন : অঙ্ক, অঙ্গ, আকাঙ্ক্ষা, আতঙ্ক, কঙ্কাল, গঙ্গা, বঙ্কিম, বঙ্গ, লঙ্ঘন, শঙ্কা, শৃঙ্খলা, সঙ্গে, সঙ্গী ।
৫. শব্দের শেষে বিসর্গ (ঃ) থাকবে না ।
যেমন : ইতস্তত, কার্যত, ক্রমশ, পুনঃপুন, প্রথমত, প্রধানত, প্রয়াত, প্রায়শ, ফলত, বস্তুত, মূলত ।
এছাড়া নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে শব্দমধ্যস্থ বিসর্গ-বর্জিত রূপ গৃহীত হবে । যেমন : দুস্থ, নিস্তব্ধ, নিস্পৃহ, নিশ্বাস ।
এছাড়া নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে শব্দমধ্যস্থ বিসর্গ-বর্জিত রূপ গৃহীত হবে । যেমন : দুস্থ, নিস্তব্ধ, নিস্পৃহ, নিশ্বাস ।
৬. তৎসম শব্দের শেষে যদি ‘ৎ’ থাকে, তবে তা বহাল থাকবে। যেমন: বিদ্যুৎ, জগৎ, হঠাৎ।
শেষে ‘ৎ’ আছে এমন শব্দের সঙ্গে ‘এ’ বা ‘এর’ বিভক্তি যোগ করা হলে ‘ৎ’ লোপ পাবে, বদলে ‘ত’ বসবে।
যেমন: ভবিষ্যৎ+এ à ভবিষ্যতে, ভবিষ্যৎ+এর à ভবিষ্যতের।
অ-তৎসম শব্দ বানানের কিছু নিয়ম
১. সকল অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে ই এবং উ এবং এদের কারচিহ্ন (ি) ও (ু) ব্যবহৃত হবে।
যেমন: আরবি, আসামি, ইংরেজি, ইমান, ইরানি, উনিশ, ওকালতি, কাহিনি, কুমির, কেরামতি, খুশি, খেয়াল, গাড়ি, গোয়ালিনি, চাচি, জমিদারি, জাপানি, জার্মানি, টুপি, তরকারি, দাড়ি, দাদি, দাবি, দিঘি, দিদি, নানি, নিচু, পশমি, পাখি, পাগলামি, পাগলি, পিসি, ফরাসি, ফরিয়াদি, ফারসি, ফিরিঙ্গি, বর্ণালি, বাঁশি, বাঙালি, বাড়ি, বিবি, বুড়ি, বেআইনি, বেশি, বোমাবাজি, ভারি(অত্যন্ত অর্থে),মামি, মালি, মাসি, মাস্টারি, রানি, রুপালি, রেশমি, শাড়ি, সরকারি, সিন্ধি, সোনারি, হাতি, হিজরি, হিন্দি, হেঁয়ালি।
৩. পদাশ্রিত নির্দেশক টি-তে ই-কার হবে। যেমন :
ছেলেটি, বইটি, লোকটি।
৪. সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া-বিশেষণ ও যোজক পদরূপে কী শব্দটি ঈ-কার দিয়ে লেখা হবে। যেমন:
এটা কী বই? কী আনন্দ ! কী আর বলব? কী করছ ? কী করে যাব? কী খেলে? কী জানি? কী দুরাশা! তোমার কী ! কী বুদ্ধি নিয়ে এসেছিলে! কী পড়ো? কী যে করি!কী বাংলা কী ইংরেজি উভয় ভাষায় তিনি পারদর্শী ।
৫.কীভাবে, কীরকম, কীরূপে প্রভৃতি শব্দেও ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ হবে । যেসব প্রশ্নবাচক বাক্যের উত্তর হ্যাঁ বা না হবে, সেইসব বাক্যে ব্যবহৃত কি ‘হ্রস্ব ই-কার’ দিয়ে লেখা হবে । যেমন :
তুমি কি যাবে? সে কি এসেছিল?
৬. শব্দের শেষে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অনুস্বার (ং) ব্যবহৃত হবে । যেমন :
গাং, ঢং, পালং, রং, রাং, সং ।
তবে অনুস্বারের সঙ্গে স্বর যুক্ত হলে ঙ হবে । যেমন : বাঙালি, ভাঙা, রঙিন, রঙের ।
বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দে অনুস্বার থাকবে ।
৭. হস-চিহ্ন যথাসম্ভব বর্জন করা হবে ।
যেমন : কলকল, করলেন, কাত, চট, জজ, ঝরঝর, টক, টন, টাক, ডিশ, তছনছ, ফটফট, বললেন, শখ, হুক ।
তবে যদি অর্থবিভ্রান্তি বা ভুল উচ্চারণের আশঙ্কা থাকে তাহলে হস-চিহ্ন ব্যবহার করা যেতে পারে । যেমন : উহ, বাহ, যাহ।
৮. ঊর্ধ্বকমা যথাসম্ভব বর্জন করা হবে । যেমন: বলে (বলিয়া), হয়ে, দুজন, চাল (চাউল), আল (আইল) ।
‘হ্রস্ব-ই’ কার ও ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার ব্যবহারের কিছু নিয়ম
১. বিশেষ্য শব্দের শেষ ‘দীর্ঘ-ঈ’ যোগ করলে বিশেষণ তৈরি হয়।
যেমন : উৎসাহ > উৎসাহী, ঋণ > ঋণী, লোভ > লোভী, ত্যাগ > ত্যাগী, গৃহ > গৃহী, ধন > ধনী, পাপ > পাপী ইত্যাদি।
২. কোনো শব্দের শেষে যদি ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার থাকে এবং তার পরে যদি ত্ব /তা/ণী/নী /সভা/পরিষদ/ভাব/ভাবে/তত্ত্ব /বিদ্যা/জগৎ/বাচক ইত্যাদি যুক্ত হয় তবে ঐ শব্দের শেষের ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার ‘হ্রস্ব-ই’ কার হয়ে যাবে।
যেমন : অধিকারী>অধিকারিত্ব, একাকী>একাকিত্ব, প্রাণী>প্রাণিজগৎ, মন্ত্রী>মন্ত্রিপরিষদ, অধিকারী>অধিকারিণী ইত্যাদি।
৩. স্ত্রীলিঙ্গ-বাচক শব্দের শেষে ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার হবে। যেমন : গাভী, দাসী, রানী, মানবী, যুবতী, নেত্রী ইত্যাদি।
৪. সন্ধির একটি নিয়ম আছে: ‘হ্রস্ব-ই’ কার + ই = ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার, ‘হ্রস্ব-ই’ কার + ঈ = ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার, ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার + ই = ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার, ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার + ঈ = ‘দীর্ঘ-ঈ’ কার; কোনো শব্দ যদি সন্ধি করার ফলে তৈরি হয়, তবে সে-সব ক্ষেত্রে ঐ নিয়মগুলো প্রয়োগ করলেই বানান নির্ভূল হবে। যেমন :
| রবি+ইন্দ্র = রবীন্দ্র পরি+ঈক্ষা = পরীক্ষা | ভর্তি+ইচ্ছু = ভর্তীচ্ছু বারি+ইন্দ্র = বারীন্দ্র | অধি+ঈশ্বর =অধীশ্বর সুধী+ইন্দ্র =সুধীন্দ্র |
শব্দের শেষে ‘-ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হলে বানানের নিয়ম
শব্দের শেষে ‘-ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হলে বানানে কিছু পরিবর্তন আসে।
১. শব্দের প্রথমে ‘অ-কার’ থাকলে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘আ-কার’ হবে।
যেমন : অঙ্গ>আঙ্গিক, পরলোক>পারলৌকিক, জগৎ>জাগতিক, গণিত>গাণিতিক, অভিধান>আভিধানিক ইত্যাদি।
২. শব্দের প্রথমে ‘ই-কার’; ‘ঈ-কার’ এবং ‘এ-কার’ থাকলে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘ঐ-কার’ হবে।
যেমন : ইচ্ছা>ঐচ্ছিক, পিচাশ>পৈশাচিক, নীতি>নৈতিক, এক>ঐকিক, দেহ>দৈহিক, হেমন্ত>হৈমন্তিক ইত্যাদি।
৩. শব্দের প্রথমে ‘উ-কার’; ‘ঊ-কার’ এবং ‘ও-কার’ থাকলে তা পরিবর্তিত হয়ে ‘ঔ-কার’ হবে।
যেমন : উপন্যাস>ঔপন্যাসিক, মুখ>মৌখিক, ভূগোল>ভৌগোলিক, কোণ>কৌণিক, লোক>লৌকিক ইত্যাদি।
বাংলা ভাষার স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণই হচ্ছে ‘অ’। এটাকে আমরা বলে থাকি ‘স্বরে-অ’, আসলে এর নাম ‘অ’। এই ‘অ’ নিয়ে শুরু বাঙলা উচ্চারণের অন্তহীন সমস্যা। কারণ এ-বর্ণটি শব্দ বা পদের আদ্য-মধ্য বা অন্তে ব্যবহৃত হ’য়ে কখনো উচ্চারিত হয় ‘অ’ রূপে, কখনো ‘ও’-কার বা ‘অর্ধ-ও-কার’ রূপে।
বাংলা উচ্চারণের নিয়ম
(একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি)
সাইফুজ্জামান খালেদ
উচ্চারণ কী?
উচ্চারণ হচ্ছে একটি বাচনিক প্রক্রিয়া। চলিত বাংলা কথ্য বাচনভঙ্গির বিভিন্ন বৈচিত্র্যের একটি সমন্বিত উচ্চারণ মানকে প্রমিত বাংলা উচ্চারণ বলা হয়।
উচ্চারণ রীতি কী?
শব্দের যথাযথ উচ্চারণের জন্য নিয়ম বা সূত্রের সমষ্টিকে উচ্চারণরীতি বলে।
৷৷ স্বরবর্ণ ৷৷
বাংলা ভাষার স্বরবর্ণের প্রথম বর্ণই হচ্ছে ‘অ’। এটাকে আমরা বলে থাকি ‘স্বরে-অ’, আসলে এর নাম ‘অ’। এই ‘অ’ নিয়ে শুরু বাঙলা উচ্চারণের অন্তহীন সমস্যা। কারণ এ-বর্ণটি শব্দ বা পদের আদ্য-মধ্য বা অন্তে ব্যবহৃত হ’য়ে কখনো উচ্চারিত হয় ‘অ’ রূপে, কখনো ‘ও’-কার বা ‘অর্ধ-ও-কার’ রূপে।
নিচে আদ্য-মধ্য ও অন্ত ‘অ’ –এর উচ্চারণের কিছু নিয়ম আলোচনা করা হল।
আদ্য –অ
১. শব্দের শুরুতে যদি ‘অ’ থাকে [সেটা স্বাধীন (‘অ’) কিংবা ব্যঞ্জনে যুক্ত (ক্+অ=ক, ম্+অ=ম ইত্যাদি) উভয়ই হতে পারে] তারপর হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার, হ্রস্ব উ-কার বা দীর্ঘ ঊ-কার থাকে তাহলে সে ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘ও’-কারের মতো হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| অধিক | ওধিক্ | খচিত | খোচিতো | তরী | তোরী |
| মধুর | মোধুর্ | মনুষ্য | মোনুশ্শো | বধূ | বোধু |
২. শব্দের আদ্য ‘অ’ এর পর ‘ক্ষ’ বা ‘জ্ঞ’ থাকলে তাহলে সে ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘ও’-কারের মতো হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| রক্ষা | রোক্খা | লক্ষ | লোক্খো | যজ্ঞ | জোগ্গোঁ |
৩. শব্দের আদ্য ‘অ’ এর পর যদি ‘ঋ-কার’ যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকে তাহলে সে আদ্য ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘ও’-কারের মতো হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| মসৃণ | মোসৃন্ | কর্তৃকারক | কোর্তৃকারোক্ | যকৃত | যোকৃতো |
৪. শব্দের আদ্য ‘অ’ এর পর য-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থাকলে তাহলে সে ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘ও’-কারের মতো হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| কন্যা | কোন্না | গদ্য | গোদ্দো | পদ্য | পোদ্দো |
৫. উপরে আমরা যে নিয়মগুলো আলোচনা করেছি তার একটি প্রধান ব্যতিক্রম আছে । যদি আদ্য-‘অ’ না-বোধক হয় তবে সে ‘অ’ এর উচ্চারণ অবিকৃত থাকবে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| অবিরাম | অবিরাম্ | অবিনাশী | অবিনাশি | অসুখ | অসুখ্ |
| অশুভ | অশুভো | অকৃত্রিম | অকৃত্ত্রিম্ | অন্যায় | অন্ন্যায়্ |
৬. সহিত-অর্থে বা সহার্থে ‘স’ (স্+অ=স) যদি শব্দের আদিতে থাকে তবে তার উচ্চারণ অবিকৃত থাকে। অর্থাৎ আদ্য-‘স’-এর পরে হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার, হ্রস্ব উ-কার বা দীর্ঘ ঊ-কার যায় থাকুক না কেনো সহার্থের ‘স’-এর উচ্চারণ ‘অ’-কারন্তই হবে ‘ও’-কারন্ত হবে না। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| সবিনয় | শবিনয়্ | সস্ত্রীক | শস্ত্রিক্ | সজ্ঞান | শগ্গ্যাঁন্ |
মধ্য –অ
১. শব্দমধ্যস্থিত ‘অ’ (সর্বত্র ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত), আদ্য-‘অ’-এর মতোই হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার, হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ ঊ-কার ঋ-কার, ক্ষ, জ্ঞ বা য-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের আগে থাকলে সে ‘অ’-এর উচ্চারণ ‘ও’-কারের মতো হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| পরিহরি | পোরিহোরি | ধরণী | ধরোনি | রজনী | রজোনি |
| সমভূমি | শমোভূমি | বিশেষজ্ঞ | বিশেশোগ্গোঁ | আত্মরক্ষা | আত্তোঁরোক্খা |
| বিপক্ষ | বিপোক্খো | রাজকন্যা | রাজকোন্না | অরণ্য | অরোন্নো |
২. তিন বা তার অধিক বর্ণে গঠিত শব্দের মধ্য-‘অ’-এর আগে যদি অ, আ, এ এবং ও-কার থাকে তবে সে-ক্ষেত্রে সে ‘অ’-এর উচ্চারণে ‘ও’-কার প্রবণতা থাকে সমধিক। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| বচন | বচোন্ | রতন | রতোন্ | কানন | কানোন্ |
| রাবণ | রাবোন্ | কেতন | কেতোন | শোভন | শোভোন্ |
| শোষণ | শোষোণ্ | কোমল | কোমোল্ | গোপন | গোপোন্ |
তবে এ সূত্রে আদ্য-‘অ’ যদি না-বোধক হয় কিংবা সহার্থের ‘স’ (স্+অ=স) হয়, তবে কিন্তু সে-‘অ’ বা ‘স’-এর পরের মধ্য –‘অ’ প্রমিত উচ্চারণে অবিকৃত উচ্চারিত হওয়ায় বাঞ্ছনীয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| অচল | অচল্ | অমর | অমর্ | সচল | শচল্ |
| সদল | সদল্ | সরস | শরশ্ | অশক্ত | অশক্তো |
অন্ত্য –‘অ’
শব্দ বা পদ-শেষের ‘অ’ বাংলা ভাষায় প্রায়শ উচ্চারিত হয় না (যেমন : নাক্, কান্, জলোধর্, ধান্ ইত্যাদি), অর্থাৎ অন্তিম ‘অ’ হসন্তরূপে উচ্চারিত হয় সাধারণত। কিন্তু সর্বত্র এ-নিয়ম প্রযোজ্য নয়, বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই অন্ত্য-‘অ’ কেবল রক্ষিত নয়, স্পষ্ট ও-কারন্ত উচ্চারিত হয়। এভাবে আমরা অন্ত্য-‘অ’-এর ও-কারন্ত উচ্চারণের কয়েকটি নিয়ম আলোচনা করবো।
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| পরিহরি | পোরিহোরি | ধরণী | ধরোনি | রজনী | রজোনি |
| সমভূমি | শমোভূমি | বিশেষজ্ঞ | বিশেশোগ্গোঁ | আত্মরক্ষা | আত্তোঁরোক্খা |
| বিপক্ষ | বিপোক্খো | রাজকন্যা | রাজকোন্না | অরণ্য | অরোন্নো |
১. শব্দ-শেষের সংযুক্তবর্ণের ‘অ’ সাধারণত রক্ষিত হয় এবং সংযুক্তবর্ণের প্রথমটি হসন্ত ও পরেরটি ‘ও-কারন্ত’ উচ্চারণ হয়ে থাকে। যেমন:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| পদ্ম | পদ্দোঁ | গন্ধ | গন্ধো | নষ্ট | নশ্টো |
| যুদ্ধ | জোদ্ধো | বিভক্ত | বিভক্তো | বিপন্ন | বিপন্নো |
২. ‘ত’ (ক্ত) এবং ‘ইত’ প্রত্যয়যোগে সাধিত বা গঠিত বিশেষণ বা ক্রিয়াপদের অন্ত্য-‘অ’ উচ্চারণে অনেকটা ‘ও-কারন্ত” হ’য়ে থাকে। যেমন:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| মণ্ডিত | মোন্ডিতো | বিকশিত | বিকোশিতো | ব্যথিত | বেথিতো |
৩. ‘তর’ এবং ‘তম’ প্রত্যয়যোগে গঠিত বিশেষণ পদের অন্তিম-‘অ’ সাধারণত ‘ও-কারন্ত” উচ্চারিত হয় । যেমন:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| উচ্চতর | উচ্চোতরো | শেষতম | শেষ্তমো | যোগ্যতম | জোগ্গোতমো |
৪. শব্দ শেষের ‘অ’-এর আগে যদি ‘ং(অনুস্বার)’ বা ‘ঙ’, ঋ-কার, র-ফলা, ঐ-কার বা ঔ-কার থাকে, তবে অন্তিম-‘অ’ সাধারণত ‘ও-কারন্ত” উচ্চারিত হয় । যেমন:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| হংস | হঙশো | শঙ্খ | শঙখো | অমৃত | অমৃতো |
| দৈব | দোইবো | যৌথ | জোউথো | গ্রহ | গ্রোহো |
৫. ইব, -ইল, -ইতেছ, ইয়াছ, ইতেছিল, ইয়াছিল, ইত্যাদি প্রত্যয়যোগে গঠিত ক্রিয়াপদের অন্ত্য-‘অ’, সাধারণত বিলুপ্ত হয় না এবং উচ্চারণে ওই ‘অ’ প্রায়শ ও-কারন্ত হয়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| প্রকাশিল | প্রোকাশিলো | আসিব | আশিবো | বুঝেছ | বুঝেছো |
৬. বাংলা সংখ্যাবাচক শব্দের ১১ থেকে ১৮ পর্যন্ত শব্দের (এগুলোও বিশেষণ-জ্ঞাপক) অন্ত্য-‘অ’, সাধারণত বিলুপ্ত হয় না এবং উচ্চারণে ওই ‘অ’ ও-কারন্ত হয়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| এগার | এ্যাগারো | তের | ত্যারো | পনের | পনেরো |
৷৷ যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ বা ‘ফলা’ ৷৷
বাংলা ভাষায় বেশকিছু যুক্তবর্ণ বা ‘ফলা’ ব্যবহৃত হয়। এ-গুলোর বানান যেমন বিচিত্র, তেমনি উচ্চারণও বৈচিত্র্যময়। ছাত্র-ছাত্রীদের এ-সব ‘ফলা’র উচ্চারণ নিয়ে প্রায়শ বিভ্রান্ত হতে হয়। কারণ পদের প্রথমে ব্যবহৃত ‘ফলা’ বা যুক্তবর্ণের উচ্চারণ এক রকম , পদ-মধ্যে বা অন্তে হয় অন্যরকম। নিচে কিছু ‘ফলা’-র উচ্চারণ সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
‘ব’-ফলা
১. পদের আদ্য বা প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণে ‘ব’-ফলা সংযুক্ত হলে সাধারণত সে-‘ব’ ফলার কোনো উচ্চারণ হয় না, তবে ব-ফলাযুক্ত বর্ণটির উচ্চারণে স্বাভাবিকের তুলনায় সামান্য ঝোঁক বা শ্বাসঘাত পড়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| স্বপ্ন | শপ্নো | ত্বরা | তরা | স্বস্তি | শোস্তি |
২. বাংলা উচ্চারণের ধারা-অনুসারে পদের মধ্যে কিংবা শেষে ‘ব’-ফলা সংযুক্ত হলে সাধারণত সংযুক্তের বর্ণের উচ্চারণ-দ্বিত্ব ঘটে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| ভূস্বামী | ভুশ্শামি | ভাস্বর | ভাশ্শর | বিশ্ব | বিশ্শো |
৩. উৎ (উদ্) উপসর্গযোগে গঠিত শব্দের ‘ব-ফলা’র উচ্চারণ সাধারণত অবিকৃত থাকে। অর্থাৎ ‘উদ’-এর ‘দ’-এর দ্বিত্ব না হয়ে বাঙালা উচ্চারণে ‘ব’-এর উচ্চারণ হয়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| উদ্বেল | উদ্বেল্ | উদ্বিগ্ন | উদ্বিগ্নো | উদ্বেগ | উদ্বেগ |
৪. বাংলা শব্দে ‘ক্’ থেকে সন্ধির সূত্রে সাধারণত ‘গ’ আসে এবং সেই আগত ‘গ’-এর সঙ্গে ব-ফলা যুক্ত হলে, সে-ক্ষেত্রে ‘গ’-এর উচ্চারণ (শব্দমধ্যে কিংবা অন্তে) দু’বার হয় না, ‘ব’-ই অবিকৃত অবস্থায় উচ্চারিত হয়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| দিগ্বধূ | দিগ্বোধূ | দিগ্বিজয়ী | দিগ্বিজোয়ি | দিগ্বসনা | দিগ্বশোনা |
৫. পদ-মধ্যে কিংবা অন্তে অবস্থিত ‘ম’-এর সঙ্গে ব-ফলা যুক্ত হলে , সে-ক্ষেত্রে ‘ব’ অবিকৃত অবস্থায় উচ্চারিত হয়ে। অর্থাৎ এ-ক্ষেত্রে ‘ম’-এর দ্বিত্ব-উচ্চারণ না হয়ে ‘ম’-এর পরে ‘ব’-এর উচ্চারণ হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| অম্বর | অম্বর | সম্বল | শম্বোল্ | বারম্বর | বারোম্বার |
৬. বাংলা ভাষায় যদি যুক্তব্যাঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ব-ফলা (বা যে কোনো ফলা) সংযুক্ত হয় তবে সে-ক্ষত্রে উচ্চারণে ব-ফলার কোনো ভূমিকা থাকে না; অর্থাৎ কোনো বর্ণকে দ্বিত্বও করে না বা ফলাটিও উচ্চারিত হয় না। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| আমসত্ত্ব | আম্শত্তো | উজ্জ্বল | উজ্জোল | পার্শ্ববর্তী | পার্শোবোর্তি |
‘ম’-ফলা
১. পদের আদ্য বা প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণে ‘ম’-ফলা সংযুক্ত হলে সাধারণত সে-‘ম’ ফলার কোনো উচ্চারণ হয় না; তবে প্রমিত-উচ্চারণে ম-ফলাযুক্ত বর্ণটি অতি-সামান্য নাসিক্য প্রভাবিত হ’য়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| স্মরণ | শঁরোন্ | শ্মুশ্রুধর | শোঁস্স্রুধর্, | শ্মশান | শঁশান্ |
২. পদের মধ্যে কিংবা শেষে ‘ম’-ফলা সংযুক্তবর্ণ সাধারণত দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়ে থাকে। তবে এই ‘ম’ যেহেতু বর্গের পঞ্চম বর্ণ বা অনুনাসিক ধ্বনি সেজন্য দ্বিত্ব উচ্চারিত শেষ বর্ণটি প্রমিত-উচ্চারণে সামান্য নাসিক্য প্রভাবিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| বিস্ময় | বিশ্শঁয়্ | আত্মা | আত্তাঁ | অকস্মাৎ | অকশ্শাঁত্ |
৩. বাংলা ভাষায় পদের মধ্যে কিংবা শেষে সর্বত্র কিন্তু ‘ম-ফলা’-যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব উচ্চারণ হয় না। বিশেষ করে গ, ঙ, ট, ণ, ন এবং ল-এর সঙ্গে ম-ফলা সংযুক্ত হলে ‘ম-ফলা’র উচ্চারণে ‘ম’ অবিকৃত থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| যুগ্ম | জুগ্মো | উন্মুক্ত | উন্মোক্তো | বল্মীক | বল্মিক্ |
৪. যুক্ত-ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে সংযুক্ত ‘ম-ফলা’র কোন উচ্চারণ হয় না। তবে এ-ক্ষেত্রেও ব্যঞ্জনবর্ণের শেষ বর্ণটিকে প্রমিত উচ্চারণে সামান্য অনুনাসিক করে করে তোলে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| লক্ষ্মণ | লক্খোঁন্ | যক্ষ্মা | জক্খোঁ | লক্ষ্মী | লোক্খিঁ |
৫. বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘ম-ফলা’যুক্ত কতিপয় সংষ্কৃত শব্দ আছে (কৃতঋণ শব্দ), যেগুলোর বানান এবং উচ্চারণে সংষ্কৃত রীতি অনুসৃত। অর্থাৎ বাংলা উচ্চারণবিধি অনুসারে উচ্চারিত না হয়ে সংষ্কৃত উচ্চারণেই প্রচলিত। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| উষ্মা | উশ্মা | চক্ষুষ্মান | চক্খুশ্মান | কুষ্মাণ্ড | কুশ্মান্ডো |
‘ল’-ফলা
১. পদের আদ্য বা প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণে ‘ল’-ফলা সংযুক্ত হ’লে সাধারণত সে-বর্ণের উচ্চারণ-দ্বিত্ব হয় না; তবে বর্ণটির সঙ্গে সংযুক্তাবস্থায় ‘ল-ফলা’র উচ্চারণ হ’য়ে থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| গ্লানি | গ্লানি | ক্লান্ত | ক্লান্তো | ম্লান | ম্লান্ |
২. পদের মধ্যে কিংবা অন্ত্য-বর্ণের সঙ্গে ‘ল-ফলা’ সংযুক্ত হ’লে সে-বর্ণের উচ্চারণ-দ্বিত্ব হয় এবং ল-এর উচ্চারণও অবিকৃত থাকে। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| মহাক্লান্ত | মহাক্ক্লান্তো | অশ্লীল | অস্স্লিল | অম্ল | অম্ম্লো |
৷৷ ‘হ’-সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ ৷৷
বাংলা ভাষায় ‘হ’ বর্ণটি যখন স্বাধীন বা স্বতন্ত্র-বর্ণরূপে পদে ব্যবহৃত হয়, তখন উচ্চারণে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু এ-বর্ণটি যে-মুহূর্তে ঋ-কার, ণ, ন, ম, য-ফলা, র-ফলা, ব, ল ইত্যাদির সাথে যুক্ত হ’য়ে পদে সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের মতো ব্যবহৃত হয়, তখন উচ্চারণে নানাবিধ সমস্যা অনিবার্য হ’য়ে ওঠে। ফলে আমরা ‘হ’-যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ-বৈশিষ্ট্য উদাহরণ সহযোগে আলোচনা করবো।
প্রথমেই মনে রাখা প্রয়োজন, ‘হ’-যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণকে, ‘হ’ প্রায়শ মহাপ্রাণতা দান করে থাকে। যেখানে ব্যঞ্জনবর্ণটির নিজস্ব মহাপ্রাণবর্ণ নেই, সেখানে ‘হ’ সেই-বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হ’য়ে উচ্চারণে মহাপ্রাণ-প্রবণতা এনে দেয়। আবার বহুক্ষেত্রে (পদের মধ্যে বা অন্তে) ‘হ’ উচ্চারণ স্থান পরিবর্তন ক’রে, যুক্তবর্ণের দ্বিত্ব-উচ্চারণ ঘটিয়ে দ্বিতীয়টিকে মহাপ্রাণবোধক করে তোলে। স্বতন্ত্র দৃষ্টান্তের সাহায্যে প্রাগুক্ত প্রস্তাবনা স্পষ্টতর হতে পারে।
‘হ’-এর সঙ্গে ণ বা ন যুক্ত হলে
হ-এর সঙ্গে ‘ণ’ কিংবা ‘ন’-যুক্ত হলে সে উচ্চারণ হয় তা কোনো মতেই ‘হ’ এবং ‘ন’-এর যুক্তধ্বনি নয়। এর উচারণ হয় অনেকটা ‘ন্হ’ এর মতো। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| চিহ্ণ | চিন্নোহ্ | বহ্ণি | বন্নিহ্ | বহ্ণ্যুৎসব | বোন্নুহ্ত্শব |
‘হ’-এর সঙ্গে ‘ম’ যুক্ত হলে
হ এবং ম-এর যুক্তরূপ ‘হ্ম’ চিহ্ণটিকেও ‘ম’-এর মহাপ্রাণরূপ বলা যায়। বাংলা ভাষায়’হ্ম’-এর ব্যবহার মূলত কতিপয় তৎসম (সংষ্কৃত) শব্দের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। নিচের কিছু দৃষ্টান্ত থেকে এর উচ্চারিত রূপ তুলে ধরতে চেষ্টা করব। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| ব্রহ্মাণ্ড | ব্রোম্মাহ্ন্ডো | ব্রহ্মা | ব্রোম্মাহ্ | ব্রহ্মদেশ | ব্রোম্মোহ্দেশ্ |
এখানে হ্ম বর্ণে ‘হ’ যথাস্থানে উচ্চারিত না হয়ে অল্পপ্রাণ ‘ম’-কে দ্বিত্ব এবং মহাপ্রাণ করে তুলেছে। (শেষ ‘ম’-এর সংঙ্গে অর্ধ বা সিকি পরিমাণ ‘হ’ যুক্ত হয়ে।)
‘হ’-এর সঙ্গে ‘য-ফলা’ যুক্ত হলে
হ–এর সঙ্গে ‘য-ফলা’ যুক্ত হ’লে ‘হ’-এর নিজস্ব কোনো উচ্চারণই থাকে না; তবে ‘য’-এর (উচ্চারিত রূপ বাংলায় সর্বত্র ‘জ’) দ্বিত্ব-উচ্চারণ হ’য়ে থাকে। প্রথমটি ‘জ’ এবং দ্বিতীয়টি ‘ঝ’ (যেহেতু ‘হ’নিজে উচ্চারণে বিলুপ্ত হ’লেও সংযুক্ত বর্ণটির দ্বিত্ব-উচ্চারণে মহাপ্রাণতা দিয়ে যায়) এর মতো উচ্চারিত হয়। দৃষ্টান্তের সাহায্যে বিষয়টি স্পষ্টতর হতে পারে।
শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| বাহ্য | বাজ্ঝো | উহ্য | উজ্ঝো | দাহ্য | দাজ্ঝো |
হ-এর সঙ্গে ‘ঋ-কার’ এবং ‘র-ফলা’ যুক্ত হলে
‘ন’ এবং ‘ম’-এর মতো ‘হৃ’ বা ‘হ্র’ মূলত ‘র’-এরই মহাপ্রাণ ধ্বনিরূপ। এর উচ্চারণ খুবই জটিল, এর উচ্চারণ-বিভ্রান্তি আমদের শিক্ষিত-সম্প্রদায়কেও বিপর্যস্ত করে তোলে। দৃষ্টান্তের সাহায্যে বিষয়টি স্পষ্টতর হতে পারে।
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| হৃদয় | রিহ্দয় | হৃৎপিণ্ড | রিহ্ত্পিন্ডো | অপহৃত | অপোরিহ্তো |
‘হ’-এর সঙ্গে ‘ল’ যুক্ত হলে
‘হ’ এবং ‘ল’-এর যুক্তরূপ ‘হ্ল’ চিহ্ণটিকেও ‘ল’-এর মহাপ্রাণরূপ বলা যায়। এখানেও ‘ল’-এর দ্বিত্ব-উচ্চারণ হ’য়ে থাকে। প্রথম ‘ল’-টি অল্পপ্রাণ, দ্বিতীয়টি মহাপ্রাণ (শেষ ‘ল’-এর সঙ্গে অর্ধ বা সিকি পরিমাণ ‘হ’ যুক্ত হয়।)। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| আহ্লাদ | আল্লাহ্দ্ | প্রহ্লাদ | প্রোল্লাহ্দ্ | হ্লাদিনী | লাহ্দিনি |
‘হ’-এর সঙ্গে ‘ব’ যুক্ত হলে
‘হ’-এর সঙ্গে যে ‘ব’ যুক্ত হয়, সংষ্কৃতভাষায় সে-‘ব’ অন্তস্থ ‘ব’ হলেও বাংলা ভাষায় উচ্চারণে তা বর্গীয় ‘ব’-এরই অনুরূপ। আবার তা বিশুদ্ধ ‘ব’-এর মতোও উচ্চারিত হয় না। ফলে ‘হ্ব’-এর উচ্চারণ পদ্ধতিতে কিছুটা বৈচিত্র্য দেখা যায়। এখানেও ‘হ’-এর উচ্চারণ বিলুপ্ত হয়ে ‘ব’-এর দ্বিত্ব-উচ্চারণ হ’য়ে থাকে। এখানে প্রথম ‘ব’-টির উচ্চারণ অনেকটা ‘ও’-এর মতো হয়ে যায় এবং আগের মতোই দ্বিতীয় ‘ব’-টি উচ্চারণের সময়ে মহাপ্রাণরূপ ‘ভ’-এর মতো হয়ে যায়। আবার যদি ‘হ্ব’-এর পূর্বের বর্ণেই যদি হ্রস্ব ই-কার থাকে তাহলে প্রথম ‘ব’-এর উচ্চারণ ‘ও’-এর মতো না হয়ে ‘উ’-কারের মতো হয়। যথা:
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| জিহ্বা | জিউ্ভা | আহ্বান | আও্ভান্ | গহ্বর | গও্ভর্ |
সারাদেশের টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যালোচনা করে নির্বাচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের উচ্চারণ
| শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ | শব্দ | উচ্চারণ |
| শাশ্বত | শাশ্শোতো | আত্মীয় | আত্তিঁয়ো | মসৃন | মোসৃন্ |
| রক্ষা | রোক্খা | অভিধান | ওভিধান্ | ক্ষণ | খন্ |
| মৌন | মৌনো | সন্দিগ্ধ | শোন্দিগ্ধো | আহ্লাদ | আল্লাহ্দ্ |
| নিমজ্জন | নিমোজ্জোন্ | অদক্ষ | অদোক্খো | যুগসন্ধি | জুগোশোন্ধি |
| মহারষ্ট্রীয় | মহারাশ্ট্রিয়ো | বৈজ্ঞানিক | বোইগ্গাঁনিক্ | খবর | খবোর্ |
| উচ্ছৃঙ্খল | উচ্ছৃঙ্খোল্ | ঐহিক | ওইহিক্ | দায়িত্ব | দায়িত্তো |
| উদ্বিগ্ন | উদ্বিগ্নো | যুগ্ম | জুগ্মো | একতা | একোতা |
| সম্মান | শম্মান্ | দুঃসহ | দুশ্শহো | হৃদয় | রিহ্দয় |
| প্রশ্ন | প্রোস্নো | উদ্বাস্তু | উদ্বাস্তু | হৃৎপিণ্ড | রিহ্ত্পিন্ডো |
| বিহ্বল | বিউ্বল্ | বিদ্বান | বিদ্দান্ | অরুণ | ওরুন্ |
| কক্ষ | কোক্খো | আত্মা | আত্তাঁ | তটিনী | তোটিনি |
| সায়াহ্ণ | শায়ান্নোহ্ | বিজ্ঞ | বিগ্গোঁ | অতঃপর | অতোপ্পর |
| অভ্যাগত | ওব্ভাগতো | জিহ্বা | জিউ্বা | অদ্য | ওদ্দো |
| দৈবজ্ঞ | দোই্বোগ্গোঁ | নদী | নোদি | উচ্চারণ | উচ্চারোন্ |
| আহ্বান | আও্ভান্ | ভ্রমন | ভ্রোমোন্ | অভিজাত | ওভিজাত্ |
| সম্পৃক্ত | শম্পৃক্তো | একা | অ্যাকা | ক্ষত | খতো |
| অধ্যাপক | ওদ্ধাপোক্ | লক্ষণ | লোক্খোঁন্ | হীনতা | হিনোতা |
| গ্রীষ্ম | গ্রিশ্শোঁ | স্মরণ | শঁরোন্ | তব | তবো |
| অদম্য | অদোম্মো | বাহ্য | বাজ্ঝো | শ্মশ্রু | শোঁস্রু |
| গহ্বর | গও্ভর্ | কেমন | ক্যামোন্ | বহ্ণি | বন্নিহ্ |
| হৃষ্ট | রিহ্শ্টো | লাঞ্ছনা | লান্ছোনা | চিহ্ণ | চিন্নোহ্ |
| পদ্ম | পদ্দোঁ | অভিনেতা | ওভিনেতা | দাহ্য | দাজ্ঝো |
This is an example post, originally published as part of Blogging University. Enroll in one of our ten programs, and start your blog right.
You’re going to publish a post today. Don’t worry about how your blog looks. Don’t worry if you haven’t given it a name yet, or you’re feeling overwhelmed. Just click the “New Post” button, and tell us why you’re here.
Why do this?
The post can be short or long, a personal intro to your life or a bloggy mission statement, a manifesto for the future or a simple outline of your the types of things you hope to publish.
To help you get started, here are a few questions:
You’re not locked into any of this; one of the wonderful things about blogs is how they constantly evolve as we learn, grow, and interact with one another — but it’s good to know where and why you started, and articulating your goals may just give you a few other post ideas.
Can’t think how to get started? Just write the first thing that pops into your head. Anne Lamott, author of a book on writing we love, says that you need to give yourself permission to write a “crappy first draft”. Anne makes a great point — just start writing, and worry about editing it later.
When you’re ready to publish, give your post three to five tags that describe your blog’s focus — writing, photography, fiction, parenting, food, cars, movies, sports, whatever. These tags will help others who care about your topics find you in the Reader. Make sure one of the tags is “zerotohero,” so other new bloggers can find you, too.