বল বীর- বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
নেহারি শব্দের অর্থ দেখে। হিমালয়ের পর্বত শ্রেণিগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। হিমাদ্রি, হিমাচল ও শিবালিক। মহান হিমালয় বা হিমাদ্রি হল হিমালয় পর্বতমালার সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণী। বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, মাউন্ট এভারেস্ট, সেইসাথে অন্যান্য “নিকট-সর্বোচ্চ” শৃঙ্গ, যেমন কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে এবং নাঙ্গা পর্বত, বৃহত্তর হিমালয় পর্বতের অংশ। এখানে কবি বলছেন কবির শির বা মাথা উন্নত বা উঁচু। কবির মাথা এত উঁচু যে তাঁর উঁচু মাথা দেখে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণি পর্যন্ত লজ্জ্বায় মাথা নিচু করে ফেলছে। এখানে আসলে কবির শারীরিক উচ্চতার কথা বলা হচ্ছে না; এখানে কবি মানসের বৃহত্তমতা, তাঁর অভ্রভেদী আত্মবিশ্বাসের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। একই ধরনের উচ্চারণ আমরা দেখতে পাই কবি হেলাল হাফিজের কবিতা রাখালের বাঁশি কবিতায়…
কে আছেন ?
দয়া করে আকাশকে একটু বলেন –
সে সামান্য উপরে উঠুক,
আমি দাঁড়াতে পারছি না ।
[রাখালের বাঁশি – হেলাল হাফিজ]
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত নৃশংস,
দুর্দম অর্থ যাকে সহজে দমন বা প্রতিরোধ করা যায় না, দুর্বিনীত অর্থ উদ্ধত, অবিনয়ী, অভদ্র; আর নৃশংস অর্থ ক্রূর, নিষ্ঠুর, হিংস্র। সম্পূর্ণ বিদ্রোহী কবিতায় কবি সাধারণ মানুষের পক্ষে পৃথিবীর সকল অন্যায়, অপশক্তি ও অসুন্দরের প্রতি লড়াই ঘোষণা করছেন। কবির এ সংগ্রামী সত্ত্বা সহজে দমন হবার নয়, কারও পেশিশক্তি বা হুমকির সামনে কবির সত্ত্বা মিইয়ে-পড়ার নয়। কবির তার এ লড়াই-এ যে কোনো প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ণ করতে প্রস্তুত। কোনো প্রকার ব্যক্তিগত বা সামাজিক সৌজন্যবোধ তাকে তাঁর কর্তব্য পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। কবির তার ‘আমার পথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আপাত অবিনয়ী হওয়া ব্যাখ্য দিয়ে লিখেছেন …
‘অনেক সময় খুব বেশি বিনয় দেখাতে গিয়ে নিজের সত্যকে অস্বীকার করে ফেলা হয়। ওতে মানুষকে ক্রমেই ছোটো করে ফেলে, মাথা নীচু করে আনে। ওরকম মেয়েলি বিনয়ের চেয়ে অহংকারের পৌরুষ অনেক – অনেক ভালো।’
[আমার পথ – কাজী নজরুল ইসলাম]
আর অন্যায়, অসুন্দর, পুরাতনকে ধ্বংস করে নতুনের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনেক সময় নিষ্ঠুর হতে হয়। কবিরগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ;নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ‘ন্যায়দণ্ড’ শীর্ষক কবিতায় খুব সুন্দর করে লিখেছেন…
“ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা তোমার আদেশে। যেন রসনায় মম
সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়্গসম
তোমার ইঙ্গিতে।”
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ,
আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,

নটরাজ শিবের অপর একটি নাম। মহাদেব বা শিব মহাপ্রলয়ের সময় তাণ্ডব নৃত্য নেচেছিলেন; গজাসুর ও কালাসুরকে বধ করেও তিনি তাণ্ডব নৃত্য নেচেছিলেন। এই তাণ্ডব নৃত্যকলার উদ্ভাবক হিসেবে তাকে নটরাজ ডাকা হয়। তাণ্ডব ও লাস্য এই দুই নৃত্যের সঙ্গে শিবের নাম জড়িত আছে। তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক এবং পুরুষালি নৃত্য ও লাস্য হলো তাণ্ডবের নারীসুলভ বিকল্প যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আনন্দ। তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য যথাক্রমে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক| পূরাণে কথিত আছে, শিব যখন ক্ষিপ্ত হন তখনই তার এই নটরাজ রূপ প্রকাশ্যে আসে, শিবের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই নৃত্যরত নটরাজ রূপের মাধ্যমে।
কবি নিজেকে নটরাজের সাথে তুলনা করেছেন কারণ কবি একই সাথে যা কিছু অসুন্দর, অশুভ সে সকল কিছু ধ্বংস করে দিতে পারেন, আবার সেই ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন সুন্দরের সৃজন করতে পারেন। একই সাথে তিনি ধ্বংস করার ও সৃজন করার অমিত শক্তিকে ধারণ করছেন।
আমি মহাভয়,আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!
আমরা জানি পৃথ্বী শব্দের অর্থ পৃথিবী কিন্তু যখন কবি বলেন, ‘আমি অভিশাপ পৃথ্বীর’ তখন এর অন্য কোনো ব্যঞ্জনা আছে কিনা তা কিছুটা অনুসন্ধান করে দেখা যায়। পৃথিবীর প্রথম রাজা ছিলেন পৃথু। রাজা অর্থ রঞ্জনকারী। অর্থাৎ যিনি মানুষের মনোরঞ্জন করতে পারেন বা মানুষকে আনন্দ দিতে পারেন তিনিই রাজা। পৃথুই সর্বপ্রথম মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু তখন মাটি ছিল অসমতল, পাথুরে, রুক্ষ। ফসল হত না। প্রজারা অভিযোগ করলো, যেটুকু ফসল হয় তাও পৃথ্বী খেয়ে ফেলে। পৃথু তখন পৃথ্বীকে শাস্তি দেবার জন্য ধাওয়া করেন। পরে পৃথ্বীকে তিনি এই শর্তে ক্ষমা করেন যে পৃথ্বী এই পৃথিবীকে উর্বর করে দেবেন। পৃথ্বী বলেন, সব শস্য খেয়ে আমার পেটের মধ্যে অনেক দুধ তৈরি হয়েছে। তুমি মাটিকে সমতল করো এবং একটি বাছুর নিয়ে আসো যাতে দুধ দোহন করতে পারো। সেই দুধ দিয়ে মাটি উর্বরা হবে। তখন স্বয়ম্ভুব মনু, যিনি ছিলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং শতরূপার স্বামী, নিজেই বাছুর হয়ে নেমে আসেন। পৃথু তার তির, বর্শা দিয়ে মাটিকে সমতল করে তোলেন। বাছুরের সাহায্যে দুধ দোহন করেন। সেই দুধ সমতলে ঢেলে দেন পৃথু। পৃথ্বীর ওলানের দুধ কিছুতেই শেষ হয় না। তখন দেবতা, রাক্ষস, মানব সকলেই পৃথ্বীর দুধ দোহন করে সমতলে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। এভাবেই মাটি উর্বরা হয়। পৃথুর নামের সাথে মিল রেখেই পৃথ্বীর নাম রাখা হয় এবং তার নামেই পৃথিবীর নাম হয়। পৃথ্বীর দুগ্ধে পৃথিবী উর্বরা হয়েছে বলেই পৃথ্বী বা পৃথিবীর নাম হয়েছে পৃথ্বী মাতা বা পৃথিবী মাতা।
আমি দুর্বার, আমি ভেঙে করি সব চুরমার! কবি একই কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীনার প্রথম কবিতা ‘প্রলয়োল্লাস’ শীর্ষক কবিতায় লিখছেন …
‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?- প্রলয় নতুন সৃজন- বেদন।
আসছে নবীন- জীবন- হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।
তাই সে এমন কেশে বেশে প্রলয় ব’য়েও আসছে হেসে—
মধুর হেসে !
ভেঙে আবার গ’ড়তে জানে
সে চির-সুন্দর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্ !’
[প্রলয়োল্লাস – কাজী নজরুল ইসলাম]
কবির এই আপাত ধ্বংস আসলে পুরাতন জীর্ণ সবকিছুকে দূর করে নতুন ও সুন্দর জন্য ভিত্তি স্থাপনের প্রচেষ্টা।
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ‘লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!
কবি সমাজের, শাষকদের তৈরিকৃত সকল অনিয়ম, রীতি-নীতি ভেঙে সুন্দর সমাজের গোড়াপত্তন করবেন।
আমি মানি না কো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
ভীম পঞ্চপাণ্ডবের দ্বিতীয় পাণ্ডব। কথিত আছে তিনি ১০ হাজার হস্তিশক্তির অধিকারী ছিলেন। দুর্যোধন ভীমকে হত্যার উদ্দেশে বিষ প্রয়োগ করেন। পরে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে নদীতে ফেলে দেন। নদীতে ভাসমান ভীমকে রক্ষা করেন নাগরাজ বাসুকী। বাসুকী ভীমের বিষ শুষে নিলে ভীম আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন। মহাশক্তিধর ভীমের দেহ যখন নদীতে ভাসছিল তখন কবি তাকে কল্পনা করেছেন একটি ভাসমান মাইন হিসেবে।
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
বল বীর –
চির উন্নত মম শির!
‘ধূর‘ শব্দের অর্থ জটাভার বা ত্রিলোকের চিন্তাভার। শিব তার মাথায় জটাভার ধারণ করেন অথবা ত্রিলোকের চিন্তাভার ধারণ ও বহন করেন। এসকল ভার বহন ও ধারণের কারণে তারই নাম ধূর্জটি। নিজের দ্রোহী ধ্বংসত্মক রূপটি প্রকাশ করার জন্য কবি আবার নিজেকে শিবের অবতার রূপে উপস্থাপন করেছেন।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস,
আমি লোকালয়, আমি শ্মশান, আমি অবসান, নিশাবসান।
ঘুরে ফিরে কবির সেই সৃষ্টি ও ধ্বংসের আপাত বিপরীত সত্ত্বা ও শক্তির কথাই এখানে উঠে এসেছে। কবি ধ্বংস করেন, আবার সেই ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতেন। কবি অন্যায়, অবিচার, অসুন্দরের কবর রচনা যেমন করতে পারেন, আবার সেই হতোদ্যম নীরব শ্মশানে নতুনের, সুন্দরের, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করে লোকলয়ের জীবন কোলাহল আনতে পারেন। কবির অন্ধকার রাতের অবসান ঘটানো ভোরের সূর্যের মতো পৃথিবীতে নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে আসেন।
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য, মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য।
ইন্দ্রাণী শব্দের অর্থ ইন্দ্রের স্ত্রী। সূত অর্থ পুত্র। ইন্দ্রানী সূত হল ইন্দ্রের পুত্র। ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত হিন্দু পুরাণের একটি চরিত্র। তাকে প্রায়শই একজন দক্ষ যোদ্ধা হিসাবে চিত্রিত করা হয় এবং যুদ্ধে তার বীরত্ব ও পরাক্রমের জন্য পরিচিত। কবি নিজের দ্রোহী রূপ বোঝানোর জন্য জয়ন্তের উপমা দিয়েছেন। কবি তার হাতে চাঁদ এবং ললাটে সূর্যকে ধারণ করছেন। চাঁদ প্রেম ও সুন্দরের প্রতীক। অন্যদিক সূর্য একই সাথে উত্তাপ ও প্রাণের অমিত শক্তির প্রতীক। পরের লাইনে কবি আবার বলছেন কবি এক হাতে বাঁশি এবং অন্যহাতে যুদ্ধের বাদ্যযন্ত্র ধারণ করছেন। প্রেমময় স্নিগ্ধ চাঁদ, কঠোর নির্মম সূর্য; কৃষ্ণের প্রেমময় বাঁশি আবার ধ্বংসের রণতূর্য – কবি এই আপাত বিপরীত উপমাগুলো ব্যবহার করছেন কবির প্রেমিক ও দ্রোহী সত্ত্বাকে প্রকাশ করার জন্য। কবি যেমন সুন্দর সত্যকে প্রেমজ্ঞানে ধারণ করতে পারেন, বাঁশি বাজিয়ে তার বোধন করতে ও জয়গান গাইতে পারেন একই ভাবে অসুন্দর অসত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে তা ধ্বংস করে নতুনের সৃজনও করতে পারেন।আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
বেদুঈন আরবের একটি যাযাবর জাতি। সাধারণতঃ বেদুঈন লোকজন উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করেন। নিজেদেরকে তারা তাবুর লোক হিসেবে পরিচিয় দেন। কারণ, তারা এক স্থান থেকে অন্যত্র স্থানান্তরে অভ্যস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ জাতিগোষ্ঠী বাড়িতে বসবাস না করে সর্বত্র ঘুরে বেড়ান ও তাবুর নিচে বাস করেন। কবির অন্যায়-অসুন্দরের বিরুদ্ধের লড়াইয় সারা পৃথবী ব্যাপী লড়াই। কবি এ লড়াইয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেখানেই অসুন্দর ও অন্যায়ের বিকট রূপ দেখতে পান সেখানেই ছুটে যান।
কবি নিজের মাঝে বিধ্বংসী যোদ্ধা চেঙ্গিস খানকে কল্পনা করে নিজের বিদ্রোহ ও সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দিতে প্রয়াসী হয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নানা বিধ্বংসী চরিত্রকে অবলম্বন করে তাঁর দ্রোহের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। এক্ষেত্রে কখনো পুরাণ আবার কখনো ঐতিহাসিক অনুষঙ্গে ভর করে কবি তাঁর ধ্বংসকামী সত্তার পরিচয় জ্ঞাপন করেছেন। এরই অংশ হিসেবে কবি নিজেকে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল যোদ্ধা ও সেনাপতি চেঙ্গিস খানরূপে কল্পনা করেছেন। চেঙ্গিস খান অত্যন্ত নৃশংস ছিলেন। আলোচ্য কবিতায় কবি নিজেকে চেঙ্গিস খান রূপে কল্পনা করে মূলত অপশক্তি বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধাংদেহি রূপকে প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমার পথ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন
‘নিজেকে চিনলে মানুষের মনে আপনা-আপনি এত বড়ো একটা জোর আসে যে, সে আপন সত্য ছাড়া আর কাউকে কুর্নিশ করে না – অর্থাৎ কেউ তাকে ভয় দেখিয়ে পদানত রাখতে পারে না। এই যে নিজেকে চেনা, আপনার সত্যকে আপনার গুরু, পথ-প্রদর্শক কাণ্ডারি বলে জানা, এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়। এটা আত্মকে চেনার সহজ স্বীকারোক্তি। আর যদিই এটাকে কেউ ভুল করে অহংকার বলে মনে করেন, তবু এটা মন্দের ভালো – অর্থাৎ মিথ্যা বিনয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভালো – লাখো গুণে ভালো।’
[আমার পথ – কাজী নজরুল ইসলাম]
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
ঈশান হিন্দু ভগবান শিবের এক নাম। বিষাণ অর্থ শিঙা। প্রলয়কালে তিনি বিষাণ ও ডমরু বাজিয়ে সব কিছু ধ্বংস করেন, তাই তাঁর অপর নাম মহাকাল। তবে ধ্বংস থেকেই আবার নতুন সৃষ্টির শুরু বলে শিবকে মঙ্গলের দেবতাও বলা হয়। শিব বিশ্ব পুরাণের একমাত্র চরিত্র, যাঁর মাঝে আছে ধ্বংস ও সৃষ্টির যুগল-অনুষঙ্গ। নজরুল তার ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘কারার ঐ লৌহকপাট‘ গানটিতে লিখেছেন…
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।
[কারার ঐ লৌহ-কপাট – কাজী নজরুল ইসলাম]
একইভাবে ইসলাম ধর্মানুসারে ইসরাফিল একজন ফেরেস্তা, যিনি কিয়ামত বা মহাপ্রলয় ঘোষণা করবেন। ইসলামের চারজন উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতার মধ্যে তিনি অন্যতম। ইসরাফিল আল্লাহর হুকুমে কিয়ামতের দিন ঘোষণা করার জন্য জেরুজালেমের একটি পবিত্র শিলা থেকে শিঙা বাজাবেন। শিবের বিষাণ ও ইস্রাফিলের শিঙ্গা দুটিই ধ্বংসের প্রতীক। কবির ধ্বংসাত্মক সত্ত্বাকে এভাবে উপমার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন এখানে।
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
শিবের ধনুকের নাম হলো পিনাক। পাণি মানে হাত। পিনাক-পাণি বলতে এখানে শিবকে বোঝানো হয়েছে। ডমরু ও ত্রিশূল শিবের অস্ত্র। শিবের ধনু এবং বাদ্যযন্ত্র পিনাক নামে পরিচিত। এর আকার ধনুকের মত। এটা একটি গুণবিশিষ্ট লাঠি। এর দুইপ্রান্ত তন্তু সহযোগে নীচুভাবে আবদ্ধ। মহাদেব এটা দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার শামিল ব্যবহার করতেন যেমন যুদ্ধের সময় শরনিক্ষেপ এবং অন্যসময় বাদ্যযন্ত্র। মনে করা হয় শিবের ত্রিশূলের তিনটি ফলা দ্বারা সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশকে বোঝায়।। ধর্মরাজ যমের অন্য নাম, যিনি নরকের অধীশ্বর দেবতা এবং দেবগনের মধ্যে সবচেয়ে পুন্যবান। দণ্ডের সাহায্যে ইনি জীবের প্রাণ সংহার করেন। কবি সকল অসুন্দরের ধ্বংস করার প্রয়াসী, তাই তিনি নিজেকে ধর্মরাজের দণ্ডের সাথে তুলনা করেছেন।
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!

দেবতা বিষ্ণুর চার হাত। তাঁর এই চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। এখানে শঙ্খ মঙ্গলের প্রতীক। চক্র ও গদা বিধ্বংসী ক্ষমতার প্রতীক। এসকল অস্ত্র দিয়ে তিনি অপশক্তির বিনাশ ঘটিয়ে মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। আলোচ্য কবিতায় শঙ্খ ও চক্রের সঙ্গে নিজের তুলনা করে কবি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন।
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
সনাতন ধর্মের ইতিহাসে যতো মুনি, ঋষি আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এবং আলাদা চরিত্রের ঋষি হিসেবে পরিচিত দুর্বাসা মুনি। দুর্বাসা শব্দের অর্থ হচ্ছে যার সাথে বাস করা যায় না। দুর্বাসা একজন মহৎ, সিদ্ধ এবং অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে একদিকে যেমন তিনি ছিলেন নন্দিত, অন্যদিকে তিনি ছিলেন ভীতি উদ্রেককারী অভিশম্পাত প্রদানকারী ও প্রচণ্ড ক্রোধযুক্ত একজন ঋষি। তার ক্রোধাগ্নি থেকে রেহাই পাননি স্বয়ং দেবতারাও। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কারনে তিনি অত্যান্ত ক্রোধিত হতেন এবং ভয়ংকর অভিশাপ প্রদান করতেন। আর তাঁর সাধনার এমনই তেজ ছিলো যে, তার প্রদত্ত সকল অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হত। কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর উন্মত্ত্ব রূপটি বোঝানোর জন্য ক্ষ্যাপা দুর্বাসা মুনির উপমা ব্যবহার করেছেন।
অন্যদিকে বিশ্বামিত্র ছিলেন একজন ব্রহ্মর্ষি। ক্ষত্রিয়কূলে এঁর জন্ম কিন্তু কঠিন তপস্যায় ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন। কবির অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তার একনিষ্ঠতা উপস্থাপন করার জন্য বিশ্বামিত্রের শিষ্য হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!
দাবানল (Wildfire) হচ্ছে বনাঞ্চলে সংঘটিত একটি অনিয়ন্ত্রিত আগুন। প্রচণ্ড দাবদাহের কারণে অধিক ঘনত্বের বনে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। দাবানল আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর মনে হলেও এর ভেতর কিছু কল্যাণকর দিকও আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, মাঝে মাঝে আগুন না লাগলে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র (Natural Ecosystem) নষ্ট হয়ে যেতে চায়। মৃত ও পচনশীল দ্রব্যাদি পুড়ে গিয়ে শুদ্ধ হয় পরিবেশ, গাছের কাণ্ডে জমে থাকা পুষ্টি, অগ্নিকাণ্ডের পরে আবার ফেরত আসে জমিতে। যাবতীয় ক্ষতিকর পোকামাকড় ধ্বংস হয় এতে, রোগশোকের জীবাণুও নষ্ট হয়ে যায়। উচুঁ গাছের শামিয়ানা পুড়ে গেলে অন্ধকার স্যাঁতসেতে বনের উঠানে সূর্যের আলো ঢুকে পড়ে। তখন ছাইয়ের গাদায় শুরু হয় নতুন জীবন। প্রথমে তৃণ, তারপর বড় গাছ এবং ক্রমশ নিবিড় অরণ্য। এভাবেই চলতে থাকে প্রাকৃতিক অগ্নি-চক্র। কবি পৃথিবীর সকল অসুন্দর ধ্বংস করে নতুনের সৃজনের পথ সুগম করবেন।
আমি উন্মন মন উদাসীর, আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর! আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের, আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা,
প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
পৃথিবীর সকল বঞ্চিত, নিপীড়িত, অবমানিত মানুষের মর্মবেদনা, রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, অভিমানকে কবি নিজের বিদ্রোহের উপাদান হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবিরগভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!
উত্তরের বাতাস বা উত্তর বায়ু প্রবাহিত হয় শীতকালে। শীতকালের এই বাতাশ শুষ্ক এবং কঠোর, মানুষকে তা নিষ্ক্রিয় করে তোলে, স্থবির করে দেয়। এই বাতাস প্রাণের স্পর্শবর্জিত, রসকষহীন সন্ন্যাস জীবনের মতো এই বাতাস জীবনানন্দ বঞ্চিত। রবীন্দ্রনাথের গানে আছে—
“উত্তর বায় জানায় শাসন,
পাতলো তপের শুষ্ক আসন।”
মলয়-অনিল বা মলয় বাতাস বয় বসন্তকালে। এই হাওয়া অতি সুস্নিগ্ধ, মানুষের জীবনকে সে ভরিয়ে তোলে, তাকে প্রাণচঞ্চল করে তোলে। উত্তরের হাওয়ার একেবারে বিপরীত এটি—জাঢ্য নয়, অস্থিরতা এবং চাঞ্চল্যই এর লক্ষণ। সংগীত শাস্ত্র মতে পূরবী রাগিণী উদাস এবং বৈরাগ্যের ভাব প্রকাশ করে। উদাস পূরবী হাওয়া বলতে কবি হাওয়ার সেই বৈরাগ্যের মূর্তিটিও বুঝিয়েছেন।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা,
আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর,
আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
নিদাঘ মানে গ্রীষ্মকাল। আরে নির্ঝর মানে ঝরনা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপ যেমন প্রকৃতির সবকিছু পুড়িয়ে দিয়ে ধ্বংস করে ফেলেন তেমনি কবি পৃথিবীর সকল অন্যায় অসুন্দরকে ধ্বংস করবেন। আবার গ্রীষ্মের তাপ জর্জরিত ধরণীতে যেমন বর্ষার বৃষ্টি নতুন প্রাণের সঞ্চার করে তেমনি কবি ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে নতুনের সৃজন করবেন।
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী, মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্
মম বাঁশরির তানে পাশরি‘ আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
‘অর্ফিয়াসের বাঁশি‘- গ্রীক পুরাণের সেই বাঁশি, যেই বাঁশি শুনে জীব জড় সবকিছু প্রাণ পেতো, নেচে উঠতো। বদলে যেতো নদীর গতিপথ। গাছপালা তার শিকড় ছিঁড়ে সামনে এগিয়ে আসতো, কেঁদে উঠতো পাথর। পুরাণে এমনও কাহিনী আছে যে, অর্ফিয়াসের বাঁশির সুর শুনে দেবতাদের যুদ্ধ থেমে গেছে। ঝরে যাওয়া ফুলেরা জীবন ফিরে পেয়ে হেসে উঠেছে। বাঙালি জাতিকে বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে জাগ্রত করার মানসে কবি গ্রিক পুরাণে উল্লিখিত মহান শিল্পী অর্ফিয়াসের বাঁশির সাথে নিজের তুলনা করেছেন। অর্ফিয়াস গ্রিক পুরাণের একজন মহান কবি ও শিল্পী। তিনি যন্ত্রসংগীতে সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। শুধু তাই নয়, সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে তিনি ভালোবাসার পাত্রী ইউরিডিসের মন জয় করেছিলেন। কবির প্রত্যাশা, অর্ফিয়াসের বাঁশির সুরের মতো তাঁর বিদ্রোহের সুরও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাবে। সে সুরে বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হবে দেশবাসী। মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। এমন ভাবনা থেকেই কবি নিজেকে অর্ফিয়াসের বাঁশি বলে অভিহিত করেছেন। শ্যাম মানে হচ্ছে কৃষ্ণ। একই ভাবে কবি নিজেকে শ্যামের বাঁশির সাথেও তুলন করেছেন।
আমি রুষে উঠে‘ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া, ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
এখানে সপ্ত নরক, হাবিয়া দোজখ পৃথিবীর অন্যায় অসুন্দরের রূপক। বিদ্রোহী কবি পৃথিবীর সকল অন্যায় অসুন্দর নির্মূল করবেন।
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
নিখিল শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ। আর অখিল শব্দের অর্থ বিশ্ব। অন্যায় ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে কবির এ বিদ্রোহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। সারা বিশ্বের মানুষ একদিন অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব,আনিব শান্তি শান্ত উদার!
ঋষি জমদগ্নি ও স্ত্রী রেণুকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে পরশুরাম ছিলেন কনিষ্ঠ সন্তান। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, একসময় সমাজে ক্ষত্রিয় রাজাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খুবই বেড়ে যায়। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সকলে ব্রক্ষা ও বিষ্ণুর কাছে অভিযোগ জানায়। ক্ষত্রিয়দের শায়েস্তা করার জন্য ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর বরে পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মহাদেবকে তুষ্ট করে পরশু অর্থাৎ কুঠার অস্ত্রটি লাভ করেন। সেই থেকে তার নাম হয় পরশুরাম। তার প্রকৃত নাম ছিল রাম। একুশবার তিনি পৃথিবী থেকে ক্ষত্রিয়শূন্য করেন। পরশুরামে মতো কবি কঠোর হাতে পৃথিবীর অন্যায়-অসুন্দর নির্মূল করবেন।
আমি হল বলরাম স্কন্ধে, আমি উপাড়ি‘ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
বলরাম হলেন একজন হিন্দু দেবতা এবং শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা। তার অস্ত্র লাঙল বা হল। তাই তাঁকে “হলধর” ও বলা হয়।
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত! আমি চির-বিদ্রোহী বীর – বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা
চির-উন্নত শির!
নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের দুঃখকষ্ট ও আর্তচিৎকার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কবি বিপ্লব-প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন বোঝাতে তিনি উপরোক্ত কথা বলেছেন। অসাম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ নিরন্তর। যেখানেই তিনি অত্যাচার ও অনাচার দেখেছেন, সেখানেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন; নিপীড়কের বিরুদ্ধে এবং আর্তমানবতার পক্ষে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন তিনি। তাঁর হুংকারে কেঁপে উঠেছে অত্যাচারীর ক্ষমতার মসনদ। অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলেও উৎপীড়িত মানুষের পক্ষে বিপ্লব-প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করতেই তিনি উপরের চরণটির অবতারণা করেছেন।
শব্দার্থ
মম– আমার।
শির– মাথা।
নেহারি – দেখে।
হিমাদ্রি– হিমালয়।
নটরাজ– শিব, মহাদেব।
দুর্দম– দমন করা শক্ত এমন, দুর্দান্ত, দুরন্ত।
দুর্বিনীত– অবিনয়ী, উদ্ধত,অশিষ্ট।
নৃশংস– নির্দয়, নিষ্ঠুর,হিংস্র।
পৃথ্বী– পৃথিবী।
দুর্বার– নিবারণ করা বা বাধা দেওয়া শক্ত এমন, দুর্নিবার।
উচ্ছৃঙ্খল– শৃঙ্খলাহীন, শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত।
ভীম- পঞ্চপাণ্ডবের দ্বিতীয় পাণ্ডব। ভয়ঙ্কর।
ধূর্জটি– শিব, মহাদেব।
সূত– পুত্র।
শ্মশান– শবদাহের স্থান, মশান।
ভালে– কপালে।
রণতূর্য– রণশিঙ্গা, যুদ্ধঘোষণা বা যুদ্ধযাত্রার সময় যে শিঙ্গা বাজানো হতো।
ইশান – শিব, মহাদেব। উত্তর-পূর্বদিক।
বিষাণ– শিঙ্গা, বাঁশি।
হুঙ্কার– গর্জন, সিংহনাদ।
পিণাক– মহাদেব বা শিবের স্বর্গীয় ধনুক।
পিণাক-পানি – মহাদেব বা শিব।
ডমরু– ডুগডুগি। এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র।
ধর্মরাজ– যমরাজ।
প্রণব-নাদ– ওঁকার ধ্বনি।
দাবানল– বনের গাছে গাছে ঘর্ষণের ফলে যে আগুনের সৃষ্টি হয়, বন দহনকারী অগ্নি।
দাহন– দগ্ধকরণ, পোড়ানো,সন্তাপ সৃষ্টিকারী।
উন্মন– অন্যমনস্ক, উদাস।
পথবাসী– নিরাশ্রয়, পথেবাস করে এমন।
অবমানিত– অবহেলিত, অপমানিত, অসম্মানিত, পরিত্যক্ত।
মলয় অনিল – মলয় পর্বত থেকে আসা স্নিগ্ধ বাতাস।
বেণু বীণ – বাঁশ নির্মিত বাদ্যযন্ত্র, বাঁশের বাঁশি।
তিয়াসা – তৃষ্ণা, পিপাসা।
রৌদ্র রুদ্র রবি – সূর্যের উত্তপ্ত কিরণকে এখানে রৌদ্রদগ্ধ বা রবির ক্রুদ্ধ অবস্থা বোঝানো হয়েছে।
সিন্ধু উতলা – উত্তাল সাগর, ভাবাবেগে আকুল সাগর।
রুষে উঠি – রাগে খেপে উঠি।
নিখিল অখিল – সমগ্র বিশ্ব, সমুদয় সৃষ্টি।
উপাড়ি – উপড়ে ফেলে, উৎপাটিত করে।
ক্রন্দন রোল – কান্নার শব্দ, রোদন ধ্বনি।
রণভূম – যুদ্ধক্ষেত্র।
রণক্লান্ত– যুদ্ধে ক্লান্ত, যুদ্ধে অবসন্ন।